Home বিনোদন ⛔ কবি-কবিতা ও না বলা কথা।

⛔ কবি-কবিতা ও না বলা কথা।

0 0

মোঃ কামরুল ইসলাম।অনেকের মতে যিনি কবিতা লেখেন তিনি কবি।আমার মতে,কবি সেই ব্যক্তি যিনি কবিত্ব শক্তির অধিকারী।

কবি ও কবিতা কি সে বিষয়ে আজকের এইআলোচনা। কলম সাহিত্য সংসদ -লন্ডন কর্তৃক কলমের টক—-শো এলমের টক-শো তে যে কথা বলা হয়নি তা বলা খানিক টা চেষ্টা।আমরা জানি,একটি নিদির্ষ্ট প্রেক্ষাপট,ঘটনাকে রূপকধর্মী ও নান্দনিকতা সহযোগে কবিতা রচিত হয়।মুলত যিনি কবিতা লেখেন তিনি কবি।

বাংলাভাষার অন্যতম আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশের মতে-সকলে কবি নয়-কেউ কেউ কবি।অনাদিকাল হতে আধুনিক কাল পর্যন্ত যুগযুগ ধরে কবিরা তাদের নিজস্ব চিন্তাচেতনা,ভাবনা গুলোকে মনের মাধুরী মিশিয়ে সৃষ্টি করেন নিত্য নতুন কবিতা।

__কবি শব্দটি কু ক্রিয়া মুলের বংশে প্রসূত একটি শব্দ।কূ-অর্থ অ-সাধারণ(নব রূপে উত্তীর্ণ)কারী।এতে সহজে
বুঝা যায় কবি সেই মানুষ,যে সাধারণ অভিজ্ঞতাকে বা অনুভুতি বা প্রচলিত শব্দকে নতুন রূপে উত্তীর্ণ করতে
সক্ষম।
____ইংরেজী শব্দ poet ল্যাটিন ভাষার প্রথম শব্দরূপ।বিশেষ্য বাচক পূংলিঙ্গ পয়েটা,পয়েটে থেকে সংকলিত হয়েছে।ফরাসী কবি আর্থার রিম বোঁদের মতে—সকল স্তরের ভালবাসা,দুঃখবেদনা,উম্মাদনার মাঝে কবিখুঁজে পান নিজকে।কবি সেই যে -সকল ধরনের বিষবাষ্পকে নিঃশেষ করতে পারেন।

কবিকে অনেকে পৃথিবীর শ্রেষ্টবৈজ্ঞানিক হিসাবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।মুলত কবি তিনি আঁধার থেকে যে আলো কুঁড়িয়ে দীপ্ততা ছড়ায় সর্বময় সর্বক্ষণ।___যদি ও কবির নির্দিষ্ট কোন দেশ থাকে না,থাকে না ধর্ম। কবি সকলের কবি সার্বজনীন।

অন্যদিকে কবিতা হচ্ছে পদ্য শব্দের ছন্দময় বিন্যাস।কেননা একজন কবি তার অনুভুতি,উপলব্ধি,চিন্তাকে
চিত্র কল্পের সাহায্যে উদ্ভাসিত করেন।কবিতা হচ্ছে সেই চিন্তার প্রকাশ যেখানে কবি তার কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাস্তবতার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেন।যেখানে লুকিয়ে থাকে প্রেম,বিরহ,বিগ্রহ।

অনেকের মতে,কবিতা হচ্ছে এক ধরনের শব্দ মালা।যখন চরণে চরণে মাত্রা ভেঙ্গে ছন্দ ও অন্ত্যমিল বজায় রেখে যা লেখা হয় তা হচ্ছে কবিতা।কবিতা মুলত তিন ধরনের হয়।যেমন- -স্বরবৃত্ত ছন্দ,মাত্রাবৃত্ত ছন্দ,অক্ষর বৃত্ত ছন্দ। এই ছাড়া ও রয়েছে গৌরিশ ছন্দ,গদ্য ছন্দ মুক্ত ছন্দ তবে এই গুলি গননা পদ্ধতি অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মত।
যে যাই বলুক না কেন কবিতার মুল হচ্ছে বিষয় এরপর শব্দ এবং পরবর্তীতে ফর্মা বা ফর্ম বা যাকে আমরা ছন্দ বলি। তবে একটি পরিপূর্ণ কবিতায় প্রতিলাইন সাজানো হয় পর্ব,অতি পর্ব,উপপর্ব দিয়ে এর পর উপমা তারপর অনুপ্রাস চিত্র কল্প আকারে। কবিতা সাধারনত আরো কয়েক ধরনের -চতুর্দশপদী,সিজো,ক্বাসিদা,রুবাই,হাইকু এই ছাড়াও বিশেষত কিছু কবিতা যেমন- নীতি কবিতা রম্য কবিতা দেশের কবিতা,বিরহেরকবিতা,বৃষ্টিরকবিতা ইত্যাদি।
যা না বললে নয়,বাংলা সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমধর্মীধারা প্রবর্তন করেন বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কবিতার জনক মাইকেল মধুসুদন দত্ত।ইংরেজীতে যাকে চতুর্দশপদী বা সনেট বলা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ১৪ চরণে সংঘটিত হয়।প্রতি চরনে সাধারনভাবে ১৪ টি অক্ষর থাকে। ১ম আটটি চরণকে অষ্টক এবং পরের ৬ টি চরণকে ষষ্টক বলে।অষ্টকে মুল ভাবের প্রবর্তন ও ষষ্টকে এর পরিণতি ঘটে থাকে।

এই ধরনের কবিতা কবির স্বদেশ প্রেম আবেগ ধ্বনিত হয়।__এই ছাড়া ও রূপক কবিতা ও অনুকাব্যের কথা
আমরা জানি।কোন কবিতা কোন কবি কবিতার রূপ নির্মাণে বিভিন্ন ধরনের চতুরতা বা এক ধরনের কৌশল
অবলম্বন করেন বা কোন গল্প বা ঘটনার মাধ্যমে কবি প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন সেটি রূপক কবিতা হিসাবে বিবেচিত হয়।কবি তখন কোন বিষয়কে সামনে এনে তার আড়ালে দর্শনের বহিঃ প্রকাশ ঘঠান। তখনই তা হয় রূপক কবিতা।
যেমন কবি ফররুক আহমেদের সেই বিখ্যাত কবিতা-“”রাত পোহাবার কত দেরী পাজ্ঞেরী””।

অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ছোট ছোট গভীর অর্থপূর্ণ কাব্য রচনা করেছেন যাকে অনেকে অনুকাব্য বা অল্প স্বল্প কবিতা বলে থাকেন।___যেমন- বালিকার নদীটাকে ছুঁবো বলে আমি,ডুব দিতে বার বার ভুল জলে নামি।
মনের ভাব প্রকাশ করলে তা যে কবিতা হবে তা নয়।যে ধরনের কবিতা লিখা হোক না কেন তাতে ছন্দময়তা থাকতেই হবে।_____মোদ্দা কথা,কবিতার সাথে ছন্দের সম্পর্ক থাকা উচিত। কেননা ছন্দের প্রতি মানব মনের যে অনুরাগ তা ছন্দের উপর নির্ভরশীল।ভাবপুর্ন অথচ ছন্দে সমস্যা হলে তা পাঠকের মনে আনন্দ দিতে পারে না।কারন কবিতার প্রাণের সঙ্গে ছন্দের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।একটি কবিতায় ভাব সুষ্পষ্ট,সুন্দর এবং যথাযত ভাষায় ও ছন্দে প্রকাশ পায় তখন ঐ কবিতাটি সার্থক ও উত্তম কবিতা হয়ে উঠে।
এখন অনেকে এক পাতা গদ্য লিখে মনে করেন কবিতা রচনা করেছেন আসলে কবিতা বা গদ্য কি তাই —–?গদ্য কবিতা অনেকের মতে সহজ মনে হলে ও আসলে সহজ নয়। এখন গদ্য কবিতার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়।

গদ্য কবিতা হচ্ছে -সেই কবিতা যেই কবিতা সাধারণত গদ্যে লিখিত হয়।যদি ও এর কোন নিদির্ষ্ট মান দন্ড নেই।
সুনিদির্ষ্ট সীমা নেই,পরিসীমা নেই,অন্ত্যমিলের প্রয়োজন নেই।অক্ষর বৃত্তের পয়ার থেকে চতুর্দশপদী মুক্তক ছন্দে যে বিবর্তন সে বিবর্তনের ধারায় নেমে এসেছে গদ্যছন্দ।

অনেকে মনে করেন গদ্য কবিতার কোন ছন্দ নাই।এটি আসলে ভুল ধারনা।ছন্দ ব্যতীত কবিতা হতে পারে না।গদ্য কবিতার প্রতিটি পংক্তি বা লাইনের এক ধরনের ছন্দ লুকিয়ে থাকে। যেমন -আপনি হাঁটছেন তাতে এক ধরনের ছন্দ থাকে অন্যদিকে আপনি ক্লান্ত হয়ে গন্তব্যে পোঁছানোর পূর্বে বসেপড়লেন তাতে আপনার ছন্দপতন হলো।গদ্য কবিতা ও তাই।
___মনে রাখতে হবে,গদ্যের সুরে পাঠক কবিতা পড়বেন মুগ্ধ হবেন তবে ক্লান্ত হবেন না। আমরা জানি আক্ষরিক অর্থে কোন কবিতার নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই তবুও ছন্দ পতনের আগে পাঠককে গন্তব্যে পোঁছানো গদ্যকবিতার অন্যতম শর্ত।

হিব্রু স্কলারদের দ্বারা প্রাচীন কালে গদ্য কবিতা লিখিত হলেও মুলত চর্যাপদ থেকে এসে এটি অতি আধুনিকতা
ঠেকেছে।_____বাংলা কবিতায় এটি আধুনিক সংস্করণ।বর্তমানে অনেকে এতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। অনেকের মতে,এটি শুরু হয়েছে রবীন্দ্র যুগ থেকে। মুলত ত্রিশের দশকের কবিদের হাতে এর আভির্ভাব। ৫০ এর দশকে হাসান হাফিজুর রহমান,শহীদ কাদেরীর কবিতায় গদ্য রীতি প্রবর্তিত হয়।বিশ্ব কবির” হঠাৎ দেখা”নজরুলের কৈফিয়ত”গদ্য কবিতার যেন উৎকৃষ্ট বাস্তবায়ন। গদ্য কবিতার ক্ষেত্রে কেউ যদি মুল স্বাদ গ্রহন করতে চায় তাহলে তাকে অক্ষর বৃত্তের বিশাল জমিন চষতে হবে।

গবেষক কবি,আবদুল মান্নানসৈয়দ গদ্যকবিতা সম্পর্কে বলেছেন-সুন্দর হাঁটা যেমন মানুষের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলে তেমনি গদ্য কবিতা পাঠককে গন্তব্যে পোঁছে দেয় তখন কবিতা স্বার্থকতা লাভ করে।
___তাহা ছাড়া কোন কবিতায় যদি শব্দ শুষমা না থাকে তখন যতই কাঠামোবদ্ধ ছন্দ প্রয়োগ করা হোক না কেন তা তখন কবিতা হয়ে উঠে না। আবার অনেক বিখ্যাত কবিতা রয়েছে যাতে ছন্দের কাঠামো অনুসরণ করা হয়নি তবে অন্তরালে ছন্দ লুকিয়ে ছিল। ছন্দ দু ধরনের তৈরী হয় একটি শব্দগত অন্যটি ভাবগত। ছন্দ আবার কবিতা নয় ছন্দ কবিতার একটি উপকরণ মাত্র।

ছন্দকে প্রভু জ্ঞান না করে ছন্দ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা থাকতে হবে।কোন কবিতা পাঠক যদি বিনা বাঁধায় দুলতে দুলতে গন্তব্যে পোঁছান এবং আনন্দ ও ক্লান্তি অনুভব না করেন সেইক্ষেত্রে ছন্দ একেবারে জরুরী
নয় তবে এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোন কারন নেই।
___সেই যাই হোক একজন কবি স্হান কাল পাত্র ভেদে সার্বজনীন আলোক বর্তিকা।তিনি তার দার্শনিক দৃষ্টিতে কলমের খোঁচায় সত্যকে নির্মমভাবে উপস্হাপন করেন।

কবি যতক্ষণ পর্যন্ত সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের পুজারী না হবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আর যাই হোক তিনি কবি হতে পারবেন না।একজন কবি যা লিখবেন-মানুষ মনে করে যেন- আমি তো এটাই বলতে চেয়েছিলাম,আমি তো এটাই চেয়েছিলাম।কবি হবে মানুষের, হবে মানবতার কবি হবে সুন্দরের।আর কবিতা হবে সত্যের নির্দেশক।

কবিতা হবে দর্পন,কবি হবে সভ্যতার গড়ার অন্যতম সারথি।কবিতার অপর নাম হবে শ্লোগান ও সমাজ গঠনে প্রতিবাদের ভাষা। মুলত স্বাধীনতা স্বাধীকার ভালবাসা,মানুষ,মানবতা রক্ষার হাতিয়ার হয়ে কবিরা কাজ করেন এবং তখনই আবেগ তাড়িত হয়ে সৃুখে,দুখে বিজয়ে,পরাজয়ে,সমাজের প্রতি অপরিসীম মমতা কবি লেখেন কবিতা।কবিদের অনেক সময় লিখতে লিখতে আঙ্গুলে দাগ পড়ে,হৃদপৃন্ডে এক ধরনের ছার পোকা বাঁসা বাঁধে তখন নিরাময়ের ঔষধ হচ্ছে কবিতা লেখা।

সমাজ, সংসার, মানবতা, মানুষ মানুষের অধিকার, ভালবাসা সমাজের, স্বাধীনতা সহ সর্ব বিষয়ে যখন সত্যিকার অর্থে ভাবেন এবং তার প্রতিফলন তার কবিতা বা লেখনীতে তুলে ধরেন ও সমাজকে জাগ্রত করেন এই ভাবে লিখতে লিখতে তিনি একদিন কবি হয়ে উঠেন।রবীন্দ্রনাথ তার কবিতায় সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন আর নজরুল মাটি-মানুষের কাছাকাছি থেকে স্বজাতি ও স্বদেশের স্বাধীনতা চেয়ে মানুষকে জাগ্রত করতে বহুবার কারা বরন করেছেন।শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে তিনি আমরন লড়াই করেছেন।

নজরুলে সমাজ সচেতনতার উল্লেখ যোগ্য দিক হচ্ছে শ্রেণী বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্হান গড়ে তোলা।তাই তিনি লিখলেন—জনগনে যারা যোক সম শোষে তারা মহাজন কয়- সন্তানসম পালে যারা জমি- তারা জমিদার নয়। নজরুল পরবর্তী সময়ে সুকান্তের কবিতায় মানবতাবোধের পরিচয় পাওয়া যায় (১৯৪২-১৯৪৯)।তার মতে-অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি-
_____দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিশ্ব মানবতা যখন পদদলিত হয় তখন দুর্ভিক্ষ,দূর্দশা,সামাজ্রবাদী শাসনের বিরুদ্ধে কবি
সোচ্চার হলেন।তখন তিনি লিখলেন -রানার ছুটেছে— রানার-রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে।

একটি সমাজ পরিবর্তনে ও অবক্ষয় রোধে কবি ও তার কবিতা গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখে।কবি সমাজের, সাধারন মানুষের মত।কবি বাসাহিত্যিকরা কোন দ্বীপের বাসিন্দা নয় এই মনুষ্য সমাজে তাদের বাস।সুর্যের আলো,চাঁদের আলো আলোকিত হয় তা দেহে।তবে জীবন,দর্শন,মানুষ মানবতার গভীর রহস্যকে আবিস্কার করেন কবি।যথার্থ উপলব্ধি থেকে তার চেতনাবোধ জাগ্রত হয়।কবি কখন ও ভাবেন না কি পেলেন বা পেলেন না। তিনি জীবনের চাওয়া, পাওয়াকে উপেক্ষা করে কল্পনার একটি সুন্দর জগত সৃষ্টি করেন—নিজে স্বপ্ন দেখেন, অন্যকে দেখান দেখাতে ভালবাসেন।

কবি বাস করেন ব্যক্তি মনের রাজ্যে,মানুষের দুঃখ কষ্ট সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরেন,মানুষকে সচেতন করেন
তাই সমাজ বিনির্মানে কবি, কবিতা গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখে।

NO COMMENTS

Leave a Reply