Home শিক্ষা ইসলামী তালাক, প্রচলিত তালাক” হালালা বা হিল্লা বিবাহ,রাগের মাথায় এক সাথে ৩...

ইসলামী তালাক, প্রচলিত তালাক” হালালা বা হিল্লা বিবাহ,রাগের মাথায় এক সাথে ৩ তালাক বলা-ও রুজু কি?কুরান,হাদীস অনুযাই সহি তালাক

0 0

মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণের ব্যাপারে অনেক যত্নবান। সে তুলনায়, ধর্মীয় জ্ঞানের পরিধি সীমিত। তাছাড়া একটি কথা আছে, ‘মানার আগে জানা’ অর্থাৎ কাজ করার আগে, সে কাজ সম্পর্কে জানা। কিন্তু আমাদের দেখা যায় এর বিপরীত। বিশেষভাবে তালাকের ক্ষেত্রে।

ইসলামে বিয়ের লক্ষ্য বিবাহিত নর আর নারীর পবিত্র বন্ধন যেন সুখের হয়। বিয়ের কারণে যেন কোন মানব-মানবীর জীবন দুঃখের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে সারাজীবন নষ্ট না হয়। সেই লক্ষ্যে অসুখী দম্পতিদেরকে অসুস্থ বন্ধন থেকে মুক্ত করতে ইসলাম তালাকের ব্যবস্থা রেখেছে। তালাক একটি জঘন্যতম বৈধ কাজ।

নবী পাক (সাঃ) ইহাকে চরমভাবে ঘৃনা করতেন। তালাক অর্থ বিবাহ বিচ্ছেদ (Divorce)। কোন কারণ বশতঃ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হতে থাকলে যদি চরম পর্যায়ে চলে যায় তালাক Divorce Talaqসেক্ষেত্রে ইচ্ছা করলে তারা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে, যাকে তালাক বলা হয়। তবে আল্লাহর কুরআনকে অতিক্রম করে নয়। আবার তালাকের জন্য দেশের আইন আছে। ইসলামী বিধানমতে তালাক দিতে হলে স্বামীকে মুখ দিয়ে ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করতে হয়। কিন্তু আইন অনুযায়ী তালাক শব্দ উচ্চারণ করতে হয় না।

সেক্ষেত্রে উকিল বা ম্যাজিষ্ট্রেটের মাধ্যমে লিখিতভাবে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন বা তালাক ঘটানো হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ধর্মীয় তালাক এবং আইনি তালাক ভিন্ন। আইনি তালাকে মুখ দিয়ে তালাক উচ্চারণ করলে তালাক হয় না। পরবর্তীতে যদি স্বামী-স্ত্রী চায় যে তারা আবার সংসার করবে সেক্ষেত্রে পুনরায় বিবাহ রেজিষ্ট্রি করে আইন অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। নিঃসন্দেহে ইহাতে কারও কোন আপত্তি নেই। কিন্তু ইসলামী মতে তালাক পদ্ধতি নিয়ে মানুষের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়।

প্রকৃতপক্ষে কুরআন-হাদিস গবেষণা করলে ইসলামী বিধান মতে তালাক এবং আইনি তালাকের সাথে কোন বিরোধ পরিলক্ষিত হয় না।

বিরোধ হয় শুধু কাঠমোল্লাদের অপব্যাখ্যার কারণে। কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন, আফালা তাকিলুন অর্থাৎ ‘তোমারা গবেষণা কর’। কিন্তু আমরা গবেষণা বাদ দিয়ে শুধু অনুসরণ করি।

কুরআন না বুঝলে কাঠমোল্লা হতে হবে। ফলে সমাজে ফেতনা দূর হবে না, বরং কাঠমোল্লাদের না বোঝার কারণে আজ সমাজে তালাক নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। মিথ্যা তালাকের ফতোয়া দিয়ে যে নারীকে স্বামীর বাড়ী হতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, হিল্লাহ নামক হারাম কাজ করানো হয়েছে, ছোট ছোট সন্তানদেরকে পিতা বা মাতার কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছে,

সেই ফতোয়ার উদ্যোক্তা, ফতোয়া প্রদানকারী এই কাঠামোল্লাদের ফতোয়ার তালাক সম্পুর্ণ কুরআন ও হাদীস বিরোধী। গভীরভাবে কুরআন-হাদিস গবেষণা করলে আইনী তালাকের সাথে ধর্মীয় তালাকের কোন বিরোধ থাকে না।

প্রথমেই বোঝা দরকার যে তালাক কোন পুতুল খেলা নয় যে, ইচ্ছামত পুতুল বিয়ে দিলাম আর বিয়ে ভাঙ্গলাম। তালাকের প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময় ব্যাপী। শুধু মুখ দিয়ে মেশিনের মত পটপট করে ‘তালাক, তালাক, তালাক’, বললেই তালাক হয় না। আর ইচ্ছা হলেও তালাক দেওয়া যায় না।

তালাক সম্পর্কে সঠিক তথ্যটি তুলে ধরব- ইনশাআল্লাহ। আর, তালাক সম্পর্কে আমাদের সমাজে যত ধরণের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে- সেগুলোতেও যথা সম্ভব আলোক পাত করব- ইনশাআল্লাহ।

আগে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। প্রথমতঃ ইসলামকে হেয়-প্রতিপন্ন কারিদের কাছে “তৎখানীক 3 তালাক প্রসঙ্গ” হল- সবচেয়ে মজাদার বিষয়!! তাই না?

মুসলিম শরীফের বলা হয়েছে, ‘শয়তান পানির ওপর তার সিংহাসন বিছিয়ে বসে, মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য চারদিকে তার বাহিনী পাঠায়। তাদের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টিতে যে বেশি সফল, সে শয়তানের কাছে বেশি প্রিয় হয়।

ডিউটি পালনের পর প্রত্যেকে ফিরে এসে, সর্দারের কাছে সারাদিনের কারগুজারি শুনায়। একজন একজন করে এসে বলে, আমি এটা করেছি, ওটা করেছি। শয়তান ওদের কারগুজারি শুনে মন্তব্য করে তোমরা কিছুই করতে পারো নাই। এর মধ্যে এক শয়তান এসে বলে, আমি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া বাধিয়ে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এসেছি। তখন শয়তান ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে এবং বলতে থাকে, সাবাশ! বড় কাজের কাজ করে এসেছ। (সহীহ মুসলিম-৫০৩৭)

আর একটি কথা না বললেই নয়,আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ- তিনি বলেন বাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন যে ব্যক্তি কোন স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অথবা দাসকে তার মনিবের বিরুদ্ধে প্ররোচিত বা একে অপরের বিরুদ্ধে ঝগড়া সৃষ্টি করায় সে অতপর সে আমাদের দল ভুক্ত নয়। সহিহ হাদিস আবু দাউদ শরিফ (হাদিস ২১৭৫ )তালাক আধ্যায় ৮ম।

স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি সে যেই হোক তাদের ব্যাপারে এমন টায় উল্লেখ্য রয়েছে। শয়তানের এমন কুমন্ত্র থেকে সকলকে দুরে থাকা উচিত।

দ্বিতীয়তঃকোরান ও সহীহ হাদীস” থেকে যা পাবেন, সেটা মেনে নেবেন!

‘সুন্নত তালাক বাদ দিয়ে অন্ন নিয়ম সঠিক নয়।

সুন্নত তালাক এর নিয়ম হল ৫টি

১,কথা বন্ধ করা

২,বিছানা আলাদা করা

৩,চোখ রাংগান

৪,ম্রিথ আঘাত করা

৫,নিজেদের মধ্য সালিশ করা

এই নিয়ম এ শুধরানোর পর কাজ না, হইলে পরে ধাপে ধাপে ১ মাস , ২ মাস , ৩ মাস. আলাদা আলাদা ভাবে নিয়ম অনুযায় তালাক দিবে,এই  হল তালাক এর সঠিক নিয়ম।

৬৫:১ یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَ اَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَ لَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَ مَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا ﴿۱﴾

১) হে নবী! (তোমার উম্মতকে বল,) তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর[1] তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে,[2] ইদ্দতের হিসাব রেখো[3] এবং তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিষ্কার করো না[4] এবং তারা নিজেও যেন বের না হয়; [5] যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়।[6] এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। আর যে আল্লাহর সীমা লংঘন করে, সে নিজের উপরই অত্যাচার করে।[7] তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোন উপায় করে দেবেন।[8]
[1] নবী করীম (সাঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কারণে। নচেৎ এই নির্দেশ উম্মতকে দেওয়া হচ্ছে। অথবা সম্বোধন তাঁকেই করা হয়েছে এবং বহুবচন ক্রিয়া তাঁর সম্মানার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। আর উম্মতের জন্য তো তাঁর আদর্শই যথেষ্ট। طَلَّقْتُمْ এর অর্থ হল, যখন তালাক দেওয়ার পাকা ইচ্ছা করে নিবে। (ইদ্দত মানে গণনা। অর্থাৎ, তালাকের নির্ধারিত দিন গণনা করা।)

[2] এতে তালাক দেওয়ার তরীকা ও তার সময় উল্লেখ করা হয়েছে। لِعِدَّتِهِنَّ তে ‘লাম’ অক্ষরটি ‘তাওক্বীত’ (সময় নির্ণয়) এর জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, لأَوَّلِ অথবা لاسْتِقْبَالِ عِدَّتِهِنَّ (ইদ্দতের শুরুতে) তালাক দাও। অর্থাৎ, যখন মহিলা ঋতু (মাসিক) থেকে পবিত্র হয়ে যাবে, তখন তার সাথে আর সহবাস না করেই তালাক দাও। পবিত্র অবস্থা হল তার ইদ্দতের শুরু। এর অর্থ হল, মাসিক অবস্থায় অথবা পবিত্র অবস্থায় সহবাস করার পর তালাক দেওয়া ভুল তরীকা। এটাকেই ফিকাহ শাস্ত্রের পন্ডিতগণ ‘বিদয়ী তালাক’ এবং পূর্বের (সঠিক) তরীকাকে ‘সুন্নী তালাক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর সমর্থন হাদীসেও পাওয়া যায়; ইবনে উমার (রাঃ) মাসিক অবস্থায় তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন। এতে রসূল (সাঃ) রাগান্বিত হন এবং তাঁকে তালাক প্রত্যাহার করে নিতে বলার সাথে সাথে পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর এর সমর্থনে তিনি এই আয়াতকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করেন। (বুখারীঃ তালাক অধ্যায়) তবে মাসিক অবস্থায় দেওয়া তালাকও বিদআত,

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণনা করেন যে, তিনি তার স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গোচরীভূত করলে তিনি খুব নারায হয়ে বললেনঃ তার উচিত হয়েয অবস্থায় তালাক প্রত্যাহার করে নেয়া এবং স্ত্রীকে বিবাহে রেখে দেয়া। (তালাকটি রাজয়ী তালাক ছিল, যাতে প্রত্যাহারের সুযোগ থাকে) এই হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার পর আবার যখন স্ত্রীর হায়েয হবে এবং তা থেকে পবিত্র হবে, তখন যদি তালাক দিতেই চায়, তবে সহবাসের পূর্বে পবিত্র অবস্থায় তালাক দিবে। এই ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক প্রদানের আদেশই আল্লাহ তা’আলা (আলোচ্য) আয়াতে দিয়েছেন৷ [বুখারী: ৫২৫১, মুসলিম: ১৪৭১]

তার পর হবে তালাকের প্রক্রিয়া:ইদ্দতের প্রতি (৬৫:০১) খেয়াল রেখে ও ইদ্দত গণনা করে তালাক দেবার বিধান দেয়া হয়েছে।

উত্তর:::- সর্বপ্রথম চমকে ওঠার মত চমৎকার একটি আয়াত আপনার/ আপনাদের উদেশ‍্যে তুলে ধরতে চাই- যা, আল্লাহ তায়ালা “তালাক” প্রসঙ্গেই কোরানে বলেছেন এবং সেই আয়াতটি হল- 

وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا 

অনুবাদ হবে এমন-“তোমরা আল্লাহর আয়াতকে নিয়ে ছেলে-খেলা কর না”(2:231)।

এখন সমস্ত মুসলিমদের কাছে প্রশ্ন-“কেন আল্লাহ পবিত্র কোরানে “তালাক প্রসঙ্গে” এমন কথা বললেন”?? তাহলে কি তালাকের অপব্যবহার হবে- এটা আল্লাহ জানতেন?? বলা ভুল হল!! আল্লাহ তো সবই জানেন!! হ‍্যাঁ, মুসলিমরা তালাকের অপব্যবহার করবে- এটা সর্ব জ্ঞানী আল্লাহ জানতেন এবং এই জন‍্যেই আল্লাহ মুসলিমদের সতর্ক করেছেন, এই বলে যে-

وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا 

অনুবাদ হবে এমন-“তোমরা আল্লাহর আয়াতকে নিয়ে ছেলে-খেলা কর না”(2:231)।

সুলাইমান ইবনে দাউদ (র) …. ইবনে মাখরামা (র) আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন তার পিতা হতে, তিনি বলেন- আমি মাহমুদ ইবনে লবীদ (রা)- কে বলতে শুনেছি যে, নবী (স)- কে এক ব‍্যাক্তি সম্পর্কে খবর দেওয়া হল, সে তার স্ত্রীকে একত্রে 3 তালাক দিয়েছে। এ কথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে দাড়িয়ে গেলেন এবং বললেন- সে কি আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করছে?? অথচ আমি তোমাদের মাঝেই রয়েছি!! তখন [নবী (স)- এর প্রতিক্রিয়া দেখে] এক সাহাবা দাঁড়িয়ে বললেন- হে আল্লাহর রাসুল (স), আমি কি তাকে হত‍্যা করব না”(নাষাই, কিতাবুত তালাক, হাদীস 3404)।

আমরা/ মুসলিম সমাজ আল্লাহর আয়াতকে নিয়ে ছেলে-খেলাই করেছি। ফলতঃ গোটা পৃথিবীতে “তালাক প্রসঙ্গে” ইসলাম এবং মুসলিম জাতি হাসি-ঠাট্টার পাত্রে পরিণত হয়েছে!!

যাইহোক, এ বিষয় যদি আরও কিছু বলতে যাই, তাহলে তা শুনতে খারাপ হবে এবং তাই অন্য কিছু আলোচনা না করে এই আয়াতটি দেখুন-

اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ ۗ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ

অনুবাদ-“তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যা কিছু নাযিল করা হয়েছে, তার অনুসরণ কর। নিজেদের প্রভুকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবকদের অনুসরণ কর না। কিন্তু তোমরা তো খুব কমই উপদেশ গ্ৰহণ কর”(7:3)।

তাই আমরা কোরানের অনুসরণ করব এবং কোরান বলে- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ অনুবাদ হবে এমন-“হে ইমানদারগণ!! তোমরা আল্লাহ এবং তার রাসুলের অনুসরণ কর”(3:31, 3:32, 3:132, 4:13, 4:59, 5:92, 8:1, 8:20, 8:46, 19:54, 19:56, 33:33, 33:71, 58:13, 64:12)। সুতরাং সুধীপাঠক, আমরা আমাদের আলোচনাকে কোরান ও সহীহ হাদীস কেন্দ্রিক রাখব- ইনশাআল্লাহ।

তৎখানীক 3 তালাকের সবচেয়ে নোংরা দিক হল- “হালালা বা হিল্লা বিবাহ”। যদিও “হালালা বা হিল্লা বিবাহ” ইসলাম সম্মত নয়। এ বিষয়ে বিশ্বনবী মহাম্মদ (স) বলেছেন-“হালাল কারি এবং যার জন্য হালাল করা হয়, উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন”(ইবনে মাজাহ, কিতাবুল নিকাহ, হাদীস 1934, 1935)।

এখানেই কি শেষ?? না, না, এ বিষয়ে আরও হাদীস রয়েছে, যেখানে বিশ্বনবী (স) বলেছেন-“আমি কি তোমাদের ভাড়াটিয়া পাঠার ব‍্যাপারে খবর দেব?? তারা বলল- হ‍্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল (স)। তিনি বলেন- সে হল হালাল কারি। আল্লাহ হালাল কারি এবং যার জন্য হালাল করা হয়, উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন”(ইবনে মাজাহ, কিতাবুল নিকাহ, হাদীস 1936)।

এবার মুসলিম সমাজকে কঠিন মত একটা প্রশ্ন করতে চাই, উত্তর দেবেন তো?? উপরিউক্ত হাদীস গুলো পড়েছেন?? তবে, এটা কোনও প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন তো এখন বাকি আছে!! প্রশ্নটি হল-“আমাদের আলেমগণ কি উপরিউক্ত হাদীস গুলো পড়েন নি?? না কি জানেন না”??

সুধীপাঠক, কি উত্তর দেবেন এই প্রশ্নের?? যদি পড়েই থাকেন, তাহলে আজও এই নোংরা “হালালা বা হিল্লা বিবাহ” আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে কেন?? কেন আজও নারীকে এই নোংরা প্রথার শিকার হতে হয়?? কেন আজও নারী’কে স্বামীর গুনাহ’র শাস্তি পেতে হয়?? স্বামী ভুল করে, মদ খেয়ে, রাগে তালাক দেবে-আর, তার শাস্তি স্ত্রীকে ভোগ করতে হবে?? নারীদের উপর এই অত‍্যাচারের দায়ী কে/ কারা?? তারা কি আমাদের সমাজের আলেমগণ নন??

স্বামীর ভুলের জন্য স্ত্রীকে “হালালা বা হিল্লা বিবাহের” মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কোরানে বলেছেন- كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ অনুবাদ হবে এমন-“প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ কর্মের জন্য দায়ী”(74: 38)। এখানেই কিন্তু শেষ নয়, এই বিষয়ে আল্লাহ আরও কোরানে বলেছেন-

كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ 

অনুবাদ হবে এমন-“যে যা করবে, তাই পাবে। কেউ কারোর বোঝা বহন করবে না”(6:164)। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে স্বামীর দোষে স্ত্রীকে “হালালা বা হিল্লা বিবাহের” মাধ্যমে শাস্তি পেতে হয় কেন??

আরও কিছু প্রশ্ন-“আমাদের আলেমগণ কি এই আয়াত গুলো পড়েন নি?? না কি আলেমগণ কোরান পড়ার সময় এই আয়াত গুলো বাদ দিয়ে পড়েন”??

এই সমস্ত আলেমদের উদেশ‍্যেই হয়ত পবিত্র কোরানে আল্লাহ এই আয়াত দুটি বলেছেন-

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

অনুবাদ হবে এমন-“তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করে নি, না কি তাদের ব্রেনে তালা লাগানো আছে”(47:24, 4:82)??

 

এখন কেউ যদি এই সুন্নাহ পদ্ধতি বাদ দিয়ে নিজের মনগড়া যেকোন পদ্ধতিতে তালাক দেয় তবে তা গ্রহণীয় হবেনা। যেমণ: আলকুরআন ও সহীহ হাদীসে সালাতের প্রতি রাকাতে যথা সময়ে একটি রুকু ও দুটি সিজদা দিতে হয়। এখন কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতি রাকাতে যেকোন সময়ে একাধিক রুকু ও তিন বা ততোধিক সিজদা দেয় অথবা যখন রুকু ও সিজদা দিতে হয় তখন না দিয়ে নিজের ইচ্ছামত অন্য সময়ে দেয় তবেকি তার সালাত হবে? নিশ্চয় না।

কারণ তা কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণীত নয়। আর রাসূল সা. বলেন-“কেউ আমাদের শরী’আতে নেই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত”-(সহীহুল বুখারী: হাদীস নং ২৬৯৭)।

সুতরাং কেউ সুন্নাহ বাদদিয়ে বিদাতি পদ্ধতিতে নিজের ইচ্ছামত এক মজলিশে ৩ কেন ১০০ তালাক দিলেও তা তিন তালাক হিসেবে গ্রহনীয় হবেনা [বরং তা এক তালাক হিসেবে গ্রহনীয় হবে। যার দলিল সমূহ নিচে বিস্তারিত]

২. ইবনু আব্বাস রা. বলেন রাসূলুল্লাহ সা. এর যুগে এবং আবূ বাকর রা. এর যুগে ও উমার রা. এর খিলাফাতের প্রথম দু বছর পর্যন্ত একত্রিত তিন ত্বালাক এক তালাক গন্য হতো। পরে উমার রা. বলেন, লোকেরা এ বিষয়ে অতি ব্যস্ততা দেখিয়েছে যাতে তাদের জন্য ধৈর্যের অবকাশ ছিল। এখন যদি বিষয়টি তাদের জন্য কার্যকর করে দেই..। সুতরাং তিনি তা তাদের জন্য বাস্তবায়িত ও কার্যকর সাব্যস্ত করলেন-(সহীহ মুসলিম: হাদিস নং ৩৫৬৫ <মূল আরবী ও অনুবাদ: হাদিস একাডেমী)।

উক্ত হাদীস থেকে স্পস্ট বুঝা যাচ্ছে, রাসূল সা. এর যুগে অত:পর তার মৃত্যুর পর ইসলামের প্রথম খলিফা আবূ বাকর রা. এর যুগে অত:পর তার মৃত্যুর পর ইসলামের ২য় খলিফা উমার রা. এর যুগে প্রথম দু বছর(অন্য হাদীসে আছে প্রথম তিন বছর, যা পরে আসছে) পর্যন্ত কেউ একত্রে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক হিসেবে গন্য হতো। পরবর্তীতে উমার রা. দেখলেন লোকেরা শুধু একত্রে তিন তালাকই দেয়া শুরু করেছে। যা কুরআন সুন্নাহ বর্জিত এবং অতিব গুনাহের কাজ। তাই তিনি শাস্তি স্বরুপ সাময়িকভাবে তিন তালাকই কার্যকর করে দেন। যাতে পরবর্তীতে একাজ অর্থাৎ একত্রে তিন তালাক কেউ না দেয়। আর একত্রে এক মাজলিসে তিন তালাক দেয়া চরম অন্যায় ও গুনাহের কাজ(যার আরো স্পষ্ট দলীল পরে আসছে)। সুতরাং একত্রে প্রদত্ত তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই গন্য হবে।

৩. আবূস সাহবা রাহ. ইবনু আব্বাস রা. কে বললেন, আপনি কি জানেন নাবী সা. এর যুগে , আবূ বাকর রা. এর যুগে এবং উমার রা. এর খিলাফাতের প্রথম তিন বছর পর্যন্ত তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গন্য করা হত। তিনি বললেন হ্যা-(সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ৩৫৬৬ <মূল আরবী ও অনুবাদ: হাদীস একাডেমী)।
সুতরাং একত্রিত তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গন্য হবে।

৪. মাহমুদ ইবনু লাবীদ রা. বলেন, রাসূল সা. কে জনৈক ব্যাক্তি সম্পর্কে খবর দেয়া হলো, যে তার স্ত্রীকে একত্রে তিন তালাক দিয়েছে। একথা শুনে রাসূল সা. ভিষণ ক্রুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং বলেন, আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হবে!!! অথচ আমি তোমাদের মাঝে বেচে আছি। তখন একজন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমিকি ওকে হত্যা করবো না??-(সুনান আন নাসা’য়ী: হাদীস নং ৩৪০২ সহীহ)।

উক্ত হাদীসে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ঐ ব্যাক্তি তালাকের শব্দ সংখ্যা ও পদ্ধতি নিয়ে খেলা করেছে। আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে নিজের ইচ্ছা প্রয়োগ করেছে। কেননা মহান আল্লাহর অহীর বিধান অনুযায়ী তালাকের পদ্ধতি হলো স্ত্রীর ইদ্দাত গননা করে ইদ্দাতের মধ্যে সহবাসহীন অবস্থায় তিন ঋতু মুক্তি কালের প্রত্যেক ঋতু মুক্তিতে একটি করে তালাক দেয়া (যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে)। অথচ সে তা বাদ দিয়ে উক্ত বিধানকে হাল্কা করে দেখেছে। আর রাসূল সা. এর রাগের কারণ সেটাই।
সুতরাং কেউ একত্রে তিন তালাক দিলেও তা কখনোই তিন তালাক হিসেবে গ্রহণীয় হবেনা। বরং এক তালাক হিসেবে গ্রহণীয় হবে(যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে)।

৫. ইবনু আব্বাস রা. বলেন, রুকানার পিতা আব্দু ইয়াযীদ তার স্ত্রী উম্মু রুকানাকে তালাক দেন এবং মুযাইনাহ গোত্রের এক মহিলাকে বিবাহ করেন। একদিন মুযাইনাহ গোত্রের ঐ মহিলা নাবী সা. এর কাছে এসে বলল, তার স্বামী সহবাসে অক্ষম।…আপনি আমার ও তার মাঝে বিচ্ছেদ করিয়ে দিন। নাবী সা. এতে অসন্তুষ্ট হন।…অত:পর তিনি আব্দু ইয়াযীদকে ডেকে বলেন, তুমি তাকে তালাক দাও। সুতরাং তিনি তাকে তালাক দিলেন। অত:পর নাবী সা. বলেন তুমি উম্মু রুকানাকে পুনরায় গ্রহণ(বিবাহ) করো। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমিতো তাকে তিন তালাক দিয়েছিলাম!! নাবী সা. বললেন, আমি তা জানি। তুমি তাকে গ্রহণ(বিবাহ) করো। এরপর তিনি সা. আল কুরআনের সূরা তালাক এর ১ নং আয়াত পড়ে শুনালেন-“যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের ত্বালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দাতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে”-(সুনান আবূ দাউদ: হাদীস নং ২১৯৬ সহীহ)।
এখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, আব্দু ইয়াযীদ তার স্ত্রী উম্মু ইয়াযীদ কে একত্রে তিন তালাক দেন। এবং অপর মহিলাকে বিবাহ করেন। কিন্তু রাসূল সা. ঐ মহিলার অভিযোগ শুনে আব্দু ইয়াযীদকে বললেন ঐ মহিলাকে তালাক দিতে এবং পুনরায় উম্মু রুকানাকে বিবাহ করতে। কিন্তু আব্দু ইয়াযীদ তার একত্রিত তিন তালাককে তিন তালাক ভেবে রাসূল সা. কে বললেন সে তাকে তিন তালাক দিয়েছে। তাই সে অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন [কারণ সম্পূর্ণ তিন তালাক পতিত হওয়ার পর উক্ত তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে আর পুনরায় গ্রহণ করার সুযোগ নেই। যতক্ষন না ঐ স্ত্রীর স্বাভাবিক ভাবে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ অত:পর সহবাস হওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবে উক্ত স্বামীর সাথে তালাক না হবে(সহীহুল বুখারী: হাদীস নং ২৬৩৯)]। কিন্তু রাসূল সা. তার ভুল ভাঙ্গিয়ে বুঝালেন যে তার একত্রিত তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই গন্য। যার কারণে তিনি সা. আল কুরআনের সূরা ত্বালাক এর ১ নং আয়াতটি পড়ে শুনালেন। অর্থাৎ সে তার স্ত্রী উম্মু রুকানাকে ইদ্দাতকাল লক্ষ্য রেখে তালাক দেয়নি। যার কারণে তা এক তালাক হিসেবে গন্য হয়েছে এবং পুনরায় তারা একত্রিত হতে পেরেছে।
সুতরাং একত্রিত তিন তালাক এমনকি একশত তালাক দিলেও তা এক তালাক হিসেবে গন্য হবে।
প্রসঙ্গত, স্ত্রীর মাসিক ঋতু চলা কালিন অবস্থায় তালাক দেয়াও বড় অন্যায় এবং গুনাহের কাজ যা নিষিদ্ধ। তবে কেউ এ অবস্থায় তালাক দিয়ে ফেললেও তা পূর্বের মত অর্থাৎ ১,২,৩,১০০ যাই দিকনা কেন তা এক তালাক হিসেবে গন্য হবে এবং তৎক্ষনাৎ স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে হবে। অত:পর চাইলে নিয়মানুযায়ী তালাক দিতে হবে-(সহীহ মুসলিম: হাদীস নং-৩৫৪৯ <মূল আরবী ও অনুবাদ: হাদীস একাডেমী)।

যাইহোক, যারা কোরান এবং সহীহ হাদীসের আলোকে কথা বলেন!!যারা ইসলাম সম্পর্কে এবং মুসলিম সমাজ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ, তারা

প্রশ্ন করতে পারেন যে- হালালা বা হিল্লা বিবাহ কি??

প্রায়ই বিভিন্ন ওয়াজ মহফিলে একসাথে যেন-তেন ভাবে তিন তালাক দেয়াকে বন্দুক বা কামানের গুলি/ গোলা ছোঁড়ার সাথে তুলনা করতে শোনা যায়। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত যে গায়ের জোরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ট্রিগারে চাপ দিয়ে গুলি/ গোলা ছুড়লেই লক্ষ্য ভেদ করা যায় না। এর জন্য প্রথমত বন্দুক/ কামান অনুসারে ঠিকমত গুলি/ গোলা ভরতে হয় এবং তারপর ঠিকমত নিশানা তাক করে ট্রিগারে চাপ দিলে তবেই লক্ষ্য ভেদ করা সম্ভব।

বিয়ে হলো একটি বন্ধন। বর ও কনের সম্মতিতে কিছু নিয়ম মেনেই এ বন্ধন রচিত হয়। কাজেই এ বন্ধন থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিয়ম মেনেই তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, নিরর্থক কোন শপথ বা কসম করার জন্য তিনি ধরবেন না। আর তাই তালাকের বিষয়ে নির্দেশনা দেবার শুরুতে (০২:২২৪ ও ২২৫) নং আয়াতে এই ইংগিত দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মাতাল অবস্থায় বা প্রচন্ডরাগের মাথায় অবুঝের মত নিরর্থকভাবে তিন তালাকই শুধু নয়, একশ তালাক একসাথে উচ্চারণ করলেই চূড়ান্তভাবে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে না।

বরং আল- কোরআনের বিধান লংঘন করে একসাথে তিন তালাক দেয়ার অপরাধে স্বামীকে ভর্ৎসনা ও সাবধান করে দেয়া কর্তব্য এক্ষেত্রে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে ধর্মের নামে বিচ্ছেদ তো নয়ই, বরং স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পথে বাধা দেয়াটা মোটেই উচিত হবে না। অগত্যা যদি বিচ্ছেদের পথে এগুতেই হয়, তাহলে তিন তালাককে এক তালাক হিসেবে গন্য করাই বিবেকের দাবি এবং আল-কোরআন ও রাসূলের (সাঃ) শিক্ষাও তাই। এরপর ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে নির্ধারিত মেয়াদ ও নিয়ম অনুসারে ধাপে ধাপে চূড়ান্তভাবে তালাকের সিদ্ধান্ত নেয়া্ যেতে পারে।

রাগের তিনটি অবস্থা হতে পারে:

প্রথম অবস্থা: এত তীব্র রাগ উঠা যে, ব্যক্তি তার অনুভুতি হারিয়ে ফেলা। পাগল বা উন্মাদের মত হয়ে যাওয়া। সকল আলেমের মতে, এ লোকের তালাক কার্যকর হবে না। কেননা সে বিবেকহীন পাগল বা উন্মাদের পর্যায়ভুক্ত।

দ্বিতীয় অবস্থা: রাগ তীব্র আকার ধারণ করা। কিন্তু সে যা বলছে সেটা সে বুঝতেছে এবং বিবেক দিয়ে করতেছে। তবে তার তীব্র রাগ উঠেছে এবং দীর্ঘক্ষণ ঝগড়া, গালি-গালাজ বা মারামারির কারণে সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি। এগুলোর কারণেই তার রাগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ লোকের তালাকের ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অগ্রগণ্য মতানুযায়ী, এ লোকের তালাকও কার্যকর হবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “ইগলাক এর অবস্থায় তালাক কিংবা দাস আযাদ নেই”।

[সুনানে ইবনে মাজাহ (২০৪৬), শাইখ আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’ কিতাবে হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন] ইগলাক শব্দের অর্থে আলেমগণ বলেছেন: জবরদস্থি কিংবা কঠিন রাগ।

রাগাম্বিত ব্যক্তির তালাকের মাসয়ালায় বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক এটাই সঠিক অভিমত। ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যেম এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

হাদিস শরীফে উলে­খ আছে, রাগের বশবর্তী হয়ে অর্থাৎ রাগের মাথায় তালাক দিলে তা তালাক বলে গণ্য হবে না। 

যেমন আবু দাউদ শরীফের কিতাবুত তালাক অধ্যায়ের ‘বাবু ফিত তালাক্বি আ’লা গাইজী’ অর্থাৎ ‘রাগান্বিত অবস্থায় তালাক দেয়া’ অনুচ্ছেদে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিস শরীফটি নিম্নরুপঃ

অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে উবায়দ ইবনে আবু সালিহ (র) হতে বর্ণিত, যিনি (সিরিয়ার) ইলিয়া নামক স্থানে বসবাস করতেন। তিনি বলেন, আমি সিরিয়া হতে আদী ইবনে আলী আল কিন্দীর সাথে বের হই। এরপর আমরা মক্কায় উপনীত হলে, আমাকে সাফিয়্যা বিনতে শায়বার নিকট তিনি প্রেরণ করেন। যিনি আয়শা (রা) হতে এ হাদিসটি সংগ্রহ করেন। রাবী বলেন, আমি আয়শা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ গিলাক অবস্থায় কোন তালাক হয় না বা দাস মুক্ত করা যায় না। ইমাম আবু দাউদ (র) বলেন, গিলাক অর্থ রাগান্বিত অবস্থায় তালাক প্রদান করা। (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৯১ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

২. এছাড়া নিদ্রিত ও উন্মাদ (নেশাগ্রস্থ বা রোগগ্রস্থ) অবস্থায় তালাক হয় না। (সুনানু নাসাই শরীফ-৩য় খন্ড,-৩৪৩৩ নং হাদিস এবং সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ-২য় খন্ড-২০৪১, ২০৪২ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই”(2:256)।

3) আবু  হুরাইরা  (রা)  থেকে  বর্ণিত। তিনি  বলেন, নবী (স)  বলেছেন- তালাক  মাত্রই  তা কার্যকর হয়, বুদ্ধিভ্রষ্ট ও মতিভ্রম লোকের  তালাক কার্যকর হয় না”(তিরমিযী, কিতাবুত তালাক, হাদীস 1131)। অর্থাৎ যদি  কেউ মদ খেয়ে অথবা নেসাগ্ৰস্থ অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়, সেই তালাক গ্ৰহণ যোগ্য হবে না।

   শুধুমাত্র এখানেই শেষ নয়, স্ত্রীর যদি  Period বা  ঋতু স্রাব বা মাসিক হয়- এই অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক  দেওয়া যাবে না। নিচের বর্ণিত হাদীসটি দেখুন-

“আব্দুল্লাহ  ইবনে  উমার  (রা)  বর্ণনা করেছেন যে, তিনি নবী  (স)  জীবদ্দশায়  তার  স্ত্রীকে  ঋতুবতী  অবস্থায় 1 তালাক  দিলে তার পিতা উমার ইবনে খাত্তাব  (রা)  নবী (স)- কে  জিজ্ঞাসা  করলেন। তখন  নবী ( স)  বললেন- তাকে  (তোমার ছেলেকে)  গিয়ে  বল  যে, সে  যেন তার স্ত্রীকে    স্ত্রী    হিসাবে   ফিরিয়ে   নেয়”(বুখারী, কিতাবুত তালাক, হাদীস 4871)। এখানেই কিন্তু শেষ নয়, আরও একটু বাকি আছে। নিচের হাদীসটি দেখুন-

“আয়েশা  (রা)  হতে  বর্ণিত। তিনি  বলেন, বিশ্বনবী  (স) বলেছেন- গিলাক বা রাগ অবস্থায় তালাক বা দাস মুক্তি হয় না”(আবুদাউদ, কিতাবুত তালাক, হাদীস 2191)।

  এ রকম বিয়েকে যদি হিল্লা বিয়ে বলা হত, তাহলে তো কোন আপত্তি বা সমস্যা ছিল না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা যায় আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামে-গঞ্জে ‘হিল্লা বিবাহ’ নামের এমন এক ধরনের হারাম উপায় উদ্ভাবিত হয়েছে, যার বিন্দুমাত্র ইংগিতও আল-কোরআনে নেই।

লক্ষণীয়: পরিকল্পিতভাবে যদি কেউ তিন তালাক প্রাপ্ত নারীকে তার স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে বিবাহ করে ২ বা ১ রাত্রি সহবাস করে তালাক দেয়, তবুও পূর্ব স্বামীর জন্য সে বৈধ হবেনা।
কেননা এটা চুক্তিভিত্তিক যেনা বা ব্যাভিচারের নামান্তর।
সহীহ হাদীসে এই হালালকারীকে ধারকরা বা ভাড়াটে ষাঁড় বা পাঠা বলা হয়েছে-(সুনান ইবনু মাজাহ: হাদিস নং ১৯৩৬ সহীহ)। এবং হালালকারী ও যার জন্য হালাল করা হয় উভয়কে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সা. লা’নত বা অভিশাপ করেছেন-(সুনান আদ দারিমী: তালাক অধ্যায় হাদীস নং ২২৫৮ সহীহ)। আমাদের দেশীয় পরিভাষায় এই ঘৃন্য কাজকে হিল্লা বলাহয়।

কিন্তু যখন দেখি যে, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীধারী আলেম সাহেবদের মধ্যে কেউ কেউ অশিক্ষিত মানুষের কাছে হাদিছের বক্তব্যকে ইনিয়ে বিনিয়ে বয়ান করে তা প্রয়োগ করতে দ্বিধা করেন না, তখন সত্যিই অবাক লাগে । শুধু তাই নয়, অনেকে হালাল শব্দের সাথে ‘হিল্লা’ শব্দটির মিলঝুল খোঁজার ব্যার্থ চেষ্টা করেন এবং সৌদির সেই সব বর্বরদের উপমাও টানা-হেচড়া শুরু করেন যারা মানুষকে মানুষ ভাবতেও ভুলে গেছে।

এই সব অ-ইসলামিক কাজ-কারবার আল্লাহর আইনের শুধু পরিপন্থি নয়, বরং পাপও বটে। সত্যিকার অর্থে ‘হিল্লা বিবাহ’ ধরনের কোন প্রকার এর অস্তিত্ব প্রকৃত ইসলামে নেই। দেখা যায় প্রচলিত এই ‘হিল্লা টাইপ হারাম কর্মে’ এক বাক্যে একত্রে তিন তালাক দেয়ার অবৈধ পন্থাকে জায়েজ বানাবার ফন্দিফিকির করা হয়। তারপর আবার বেদাতি ফতোয়া দিয়ে তালাক দেয়া স্ত্রীকে পুণরায় তার পূর্বের স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেবার টালবাহানা করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এই সব নামকাওয়াস্তে বিয়ের আয়োজন করা হয়।

এক্ষেত্রে সেই তালাকপ্রাপ্ত নারীর সম্মতি বা পছন্দ-অপছন্দের ব্যপারে কোন তোয়াক্কা করা তো দূরে থাক, অনেক সময় তাদের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে এমন একটি হারাম কর্ম করার জন্য নয়-ছয় বুঝিয়ে একরকম তাদেরকে বাধ্য করা হয়। একজন নামধারী আলেম কর্তৃক তা আবার জায়েজও দেখানো হয় এবং এক্ষেত্রে সেই জালেম রূপী আলেম মহাশয় টু-পাইস হারাম কামাই করে নেবার সুযোগটাও হাতছাড়া করতে চান না।

  আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ আমার উম্মাতের দুষ্ট মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তাভবনা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সেই চিন্তাভাবনা কার্যে পরিনত করে বা ব্যক্ত করে। আর কাতাদা (রহঃ) বলেনঃ মনে মনে তালাক দিলে তাতে কিছুই হয়না।]

 অন্তরের খবর সর্বজ্ঞ মহান স্রষ্টাই ভালভাবে অবগত আছেন। (হাদিছ: ) তবে পার্থিব বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোন মন্দ কর্মের বিষয়ে শুধু অন্তরে ভাবলেই বা মুখে প্রকাশ করলেই তা কার্যকর হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক নয়, বরং তা মনে মনে নিয়্যাত/ প্রতিজ্ঞা করার ও মুখে বলার সাথে সাথ কাজে-কর্মে ঠিক ঠিক ভাবে প্রকাশিত ও পালিত হলে তখনই কেবল তা কার্যকর হিসেবে ধরে নেয়াটা যুক্তিসংগত হতে পারে। পার্থিব কোন সিদ্ধান্ত ও বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এটাই উত্তম পন্থা। প্রমাণহীন শুধুমাত্র মুখের কথায় বাড়াবাড়ি করা মানুষের কাজ নয়।

বরং এসবের বিচারের ভার সূক্ষ্ম-দ্রষ্টা মহান আল্লাহতায়ালার উপরে ন্যস্ত করাই শ্রেয়। কোন অপরাধী তার অপরাধ নিজে স্বীকার করলেও রাসূল (সাঃ) তাকে শাস্তি দেয়ার আগে সেই ব্যক্তিটি পাগল কিংবা মাতাল অবস্থায় ছিল কিনা তা ভাল করে জেনে নিতেন। আর তালাকের ক্ষেত্রে যে অবশ্যই সজ্ঞানে ও সুস্থ মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিচের হাদিছে তার স্পষ্ট উল্লেখ আছে-

    [বুখারী শরীফ- ৯ম খণ্ড, ইসলামিক ফাইন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-৪৬, ২০৫০ পরিচ্ছেদ: বাধ্য হয়ে, মাতাল ও পাগল অবস্থায় তালাক দেওয়া এবং এতুদ্ভয়ের বিধান সম্বন্ধে। ভুলবশতঃ তালাক দেওয়া এবং শিরক ইত্যাদি সম্বন্ধে (এসব নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল)। কেননা নবী (সাঃ) বলেছেন: প্রতিটি কাজ নিয়্যাত অনুসারে বিবেচিত হয়। প্রত্যেকে তা-ই পায়, যার সে নিয়্যাত করে।

উসমান (রাঃ) বলেনঃ পাগল ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির তালাক প্রযোজ্য হয় না। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, নেশাগ্রস্ত ও বাধ্য হয়ে তালাক দানকারীর তালাক জায়েয নয়। উকবা ইবন আমির (রাঃ) বলেন, ওয়াসওয়াসা সম্পন্ন (সন্দেহের বাতিকগ্রস্ত) ব্যক্তির তালাক কার্যকর হয় না।]

আরো উল্লেখ্য: জোর পূর্বক, ঘুমন্ত, নাবালক, পাগল বা জ্ঞানহারা, নেশাগ্রস্থ, রাগান্বিত ব্যাক্তির প্রদত্ত তালাক কিছুই গন্য হবেনা-(আল কুরআন: সূরা নাহল-১০৬,) সূরা বাকারার ( ২:২২৪-২২৫) সুনান ইবনু মাজাহ: হাদিস নং-২০৪৬ সহীহ, সুনান আবূ দাঊদ: হাদীস নং-৪৪০৩ সহীহ, সহীহুল বুখারী: পর্ব-তালাক অধ্যায়-১১, সুনান আবূ দাউদ: হাদীস নং-২১৯৩ সহীহ)। তবে তিনটি কাজ যা বাস্তবে বা ঠাট্টাচ্ছলে করলেও তা বাস্তবিকই ধর্তব্য আর তা হলো বিবাহ,তালাক ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনা-(সনান আবূ দাউদ: হাদীস নং ২১৯৪ হাসান সহীহ)।(ফতুয়া ):কিতাবুল ফেরাহ আলাল মযাহিবিল আরবায়া ” গ্রন্থের ৪র্থ খন্ড ৩২৩ পৃষ্টায় উল্লেখ রয়েছে, ফতোয়া শামি ৩য় খন্ড ২৪৪ পৃষ্টাতে রয়েছে,ফতুয়া :কিতাবুল ফেরাহ আলাল মযাহিবিল আরবায়া ” গ্রন্থের ৪র্থ খন্ড ৩২৩ পৃষ্টায় উল্লেখ রয়েছে, ফতোয়া শামি ৩য় খন্ড ২৪৪ পৃষ্টাতে রয়েছে

হানাফী মাযহাবের ইমামগন, বলেন;

কিতাবুল ফেরাহ আলাল মযাহিবিল আরবায়া ” গ্রন্থের ৪র্থ খন্ড ৩২৩ পৃষ্টায় উল্লেখ রয়েছে,

অর্থাৎ হানাফী মাযহাবের ইমামগন, বলেন, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্ত্রীর প্রতি সম্বোধন থাকা শর্ত। এভাবে যে, স্ত্রী নাম ধরে, তাকে বুঝায় এ ধরনের সর্বনাম ব্যবহার করে, যেমন- তোমাকে তালাক কিংবা তাকে তালাক দিলাম। অথবা ইঙ্গিতবাচক বিশেষ্য ব্যবহার করা,

যেমন তালাকপ্রাপ্তা, আতপর এ ধরনের শব্দ গঠনকগত ভাবে মহিলা বা স্ত্রীকে বুঝায়।

এ থেকে বুঝা গেল উল্লেখিত ঘটনার আলোচ্য মতে (সম্বোধন) বা না থাকার কারণে উক্ত স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হয় না| যা

ফতোয়া শামি ৩য় খন্ড ২৪৪ পৃষ্টাতে রয়েছে

অর্থাৎ অপ্রকৃতস্থ, মত ব্যক্তির ন্যয় অনুরূপ ব্যক্তির ক্ষেত্রে তালাকের হুকুম দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তার কথা ও বাহিয্যিক স্বভাবগত কাজের মধ্যে নিতান্ত  বিঘ্নতার কারনে,অনুরূপ মদহুশ  ঐ ব্যাক্তির ক্ষেত্রে বলা হয়।যার বাধ্যক্যের কারনে বা কোন রোগের কারণে কিংবা আকস্মিক (দুর্ঘটনার)

দুর্ঘটনার কারণে যার বিবেক বুদ্ধিতে বিঘ্নতা ঘটে, যতক্ষণ কথায় ও কাজে বিচারবুদ্ধি চরম বিঘ্ন বা অসুবিধায় থাকবে তখন তার কথা গ্রহণীয় নয়। যদিও সে কি বলতেছে জানে এবং তার ইচ্ছে করে, কেননা এ জানা ও ইচ্ছে করা গ্রহণ যোগ্যতা

রাখে না সঠিক সুস্থ  অনুভূতি না থাকার কারণে।

আর তাই গ্রন্থে আল্লামা মুফতি সৈয়দ আমিনুল ইহসান মুজাদ্দেদী (রহঃ) মদহুশ এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,

অর্থাৎ যারা লজ্জার কারণে ;ভয়ের কারণে;;কিংবা রোগের কারণ;বিবেক বুদ্ধি লোপ পায়। কিতাবুল ফিকাহ আলাল মাযাহিবিল আরবায়া, কিতাব

এ উল্লেখ আছে অর্থাৎ যখন রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তার কথা ও কাজের ক্ষেত্রে প্রলাপ বকতে থাকে,তখন তার তালাক প্রযোজ্য নয়, আর এটাই উত্তম অভিমত।

অর্থাৎ হানিফি মাযহাবের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামদের নিকট গবেষণা লব্ধ অভিমত হল নিশ্চয়ই যারা রাগ ও তার স্বভাবচরিত্রের নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায় যে, তার কথা ও কাজে বেহুদা বিষয় প্রভাব বিস্তার তখন তার তালাক পতিত হবে না,

সুতরাং বর্ণিত উদ্ধৃত সমূহ দ্বারা বুঝা যায় যে উল্লেখিত ঘটনার আলোচ্য মতে স্বামীর আগে অস্থির হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় রুপে তালাক দেওয়া স্ত্রীর প্রতি তালাক পতিত হয় না|

 অথচ কোন পুরুষ মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় হোক বা রাগের মাথায় হোক, হঠাৎ তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে এক সাথে তিন-তালাক উচ্চারণ করলেই নাকি তালাক কার্যকর হয়ে যাবে বলে ফতোয়া দেয়া হচ্ছে। আর এর ফলে বিশেষ করে গ্রাম্য ও অশিক্ষিত সমাজের অজ্ঞ ও সরল মনের মানুষেরা ধোকা খাচ্ছে, তাদের জীবনে শান্তি নয় বরং অশান্তির বীজ রোপিত হচ্ছে এবং ছেলে-মেয়ে নিয়ে এতদিনের সাজানো সংসার, পরিবার পরিজনের সাথে সম্পর্কের বাধন, সব মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে!!?? আল্লাহর বিধানে এভাবে তালাক দেয়ার কোন অধিকার যে পুরুষকে দেয়ো হয়নি- তা কি ইসলাম প্রচারের দায়িত্বে নিয়োজিত আলেম সমাজ বোঝেন না?

শুধু তাই নয়, সুযোগ সন্ধানী মাতবর ও মোড়লদের কু-বুদ্ধিতে তখন সেই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে ফিরে পাবার আশায় অন্যের সাথে বিয়ে দেয়ার নাটকের আয়োজন করা হয় এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়া করা দ্বিতীয় স্বামীর কাছ থেকে তালাক নেবার কথা মাথায় রেখে এমনতর হারাম কর্মটি করা হয়ে থাকে। অথচ এই ধরনের ঘৃণ্য পন্থার নির্দেশনা আল- কোরআনের কোথাও বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই। কিন্তু ধর্মান্ধ ও ধর্ম-ব্যাবসায়ীদের এসব ধর্মহীন কর্মকান্ডের কারনে একদিকে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞরা অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে। অপরদিকে ইসলাম বিদ্বেষীরা কুৎসা রটানোর ও মিথ্যাচারের সুযোগ পেযে যাচ্ছে।

 মাঝে মাঝে মনে হয়- শুধু অজ্ঞরাই নয়, শিক্ষিত জ্ঞানী- গুণীজনেরাও যেন এক অজানা পাপের ভয়ে ভীত হয়ে ধর্মান্ধ ও ধর্ম-ব্যাবসায়ীদের বেড়াজালে বিবেক হারিয়ে অন্ধ সাজার ভান করে বেসুরে সুর মেলাতে ব্যস্ত। আমাদের ভুললে চলবে না যে, আল্লাহর বিধান জীবনকে জটিল ও কঠিন নয়, বরং সরল, সহজ ও অর্থবহ করে গড়ে তোলার জন্যই প্রেরিত হয়েছে।

আল- কোরআন স্বার্থবাদী ধর্মব্যবসায়ীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি নয় যে তারা মনগড়া যা বলবে ও চাইবে তাই ধর্মীয় বিধান হয়ে যাবে। আল্লাহতায়ালার কিতাব হলো মুসলিমের জীবন পরিচালনার মূল উৎস এবং সেই উৎসের সাথে সম্পৃক্ত রাসূলের (সাঃ) সকল আদর্শ আমাদের জীবন পথের পাথেয়। তাই আসুন- মহান স্রষ্টার বাণী আল-কোরআনের রশি শক্ত করে ধরি এবং রাসূলের (সাঃ) আদর্শকে সঠিকভাবে চিনে ও মেনে জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে গড়ে তুলে।

আমাদের দেশে তথা প্রচলিত তৎখানীক 3 তালাক বা একই বৈঠকে স্বামী স্ত্রীকে 3 তালাক দিলে  না কি? বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এবং পরে যদি স্বামী স্ত্রীকে আবার স্ত্রী হিসাবে পেতে চায়, তখন 1 দিনের জন্য অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে ঐ স্ত্রীর বিবাহ দিতে হবে এবং সেই 1 দিনের স্বামীর সঙ্গে যৌনমিলন করতে হবে এবং এই 1 দিনের স্বামী এই স্ত্রীকে তৎখানীক 3 তালাক দিলে, তবেই না কি ঐ স্ত্রীকে তার আগের স্বামী ফিরিয়ে নিতে পারবে। এখানে এই “1 দিনের বিবাহ”কে “হালালা বা হিল্লা বিবাহ” বলা হয়। অথচ ইসলামে “হালালা বা হিল্লা বিবাহ”কে অভিসম্পাত করা হয়েছে তথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে!!

এখন মনে মনে এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে যে-“তাহলে সঠিক তালাক পদ্ধতি কি বা কেমন”?? সুধীপাঠক, এ বিষয় নিয়েই আজকের লেখা, তাই চলুন-

আমরা তালাক প্রসঙ্গে কথা বলার আগে প্রথমে একটা আয়াত দেখাতে চাই এবং আয়াতটি হল-

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

অনুবাদ হবে এমন-“যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থাতেই (আল্লাহর পথে) অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়। এই ধরনের সৎ লোকদের আল্লাহ‌ অত্যন্ত ভালোবাসেন”(3:134)।

হালকা রাগ। স্ত্রীর কোন কাজ অপছন্দ করা কিংবা মনোমালিন্য থেকে স্বামীর এই রাগের উদ্রেক হয়। কিন্তু এত তীব্র আকার ধারণ করে না যে, এতে বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে কিংবা নিজের ভাল-মন্দের বিবেচনা করতে পারে না। বরং এটি হালকা রাগ। আলেমগণের সর্বসম্মতিক্রমে এ রাগের অবস্থায় তালাক কার্যকর হবে।এক মজলিসে জেতা ১সাখে ৩ তালাক ১ তালাক হিসাবে গননা হবে ইসলাম এ|

যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন শরীফে সূরা তালাকের মধ্যে এরশাদ করেন,

‘হে নবী! (উম্মতকে বলুন) তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাাহকে ভয় করো। তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার করো না এবং তারাও যেন বের না হয় যদি না তারা কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমা লংঘন করে, সে নিজেরই অনিষ্ট করে। তুমি জান না, হয়তো আল্লাহ এর পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন। (সূরা তালাক, আয়াত নং-১)

উল্লে­খিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে,
স্ত্রীকে তালাক দিলে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে (ইদ্দত হলো মহিলাদের রজঃস্রাব বা মাসিক চক্র)
ইদ্দত গননা করতে হবে (কয়টি ইদ্দত গণনা করতে হবে সে সম্পর্কে কিছুক্ষন পরে আয়াত পেশ করছি)
কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে (যিনা/ব্যভিাচার) লিপ্ত না হলে স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করো না অর্থাৎ তালাক দেয়া যাবে না।
এ তিনটি বিষয় হলো আল্লাহ কর্তৃক তালাকের নির্ধারিত সীমা, যা লংঘন করলে নিজের অর্থাৎ তালাক প্রদানকারীর অনিষ্ট হবে
উল্লে­খিত তিনটি সীমা তালাকের জন্য নির্দিষ্ট। এর হেরফের হলে তালাক হবে না।
আল্লাহ কোন নতুন উপায় করে দেবেন’ এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে বলা হয়েছে ‘স্বামীর অন্তরে তালাকের ব্যাপারে অনুতপ্ত সৃষ্টি হবে’। ফলে হয়তো তারা আবার সংসার করতে পারবে।
এবার সূরাতালাকের ২নং আয়াতের দিকে লক্ষ্য করি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,
‘অতঃপর তারা যখন তাদের ইদ্দতকালে পৌঁছে, তখন তাদেরকে যথোপযুক্ত পন্থায় রেখে দেবে অথবা যথোপযুক্ত পন্থায় ছেড়ে দেবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে দু’জন নির্ভরযোগ্য লোককে সাক্ষী রাখবে।’ (সূরা তালাক-২)
উল্লে­খিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে,
ইদ্দতকালে পৌছলে স্ত্রীকে রাখাও যাবে অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর মিল হলে রাখা যাবে অথবা মনের অমিল হলে তালাক দিবে
তালাকের ক্ষেত্রে দুই জন সাক্ষী রাখতে হবে। অর্থাৎ একা একা তালাক তালাক উচ্চারণ করলে তালাক হবে না। আবার পুনরায় সংসার করতে হলেও দুই জন সাক্ষী রাখতে হবে। যদি কেউ বলে তালাকের জন্য কোন স্বাক্ষীর দরকার নেই, পুরুষ তালাক উচ্চারণ করলেই তালাক হবে। তবে তা সম্পূর্ণ কুরআন বিরোধী অর্থাৎ কুফুরী আকিদা।
এবার সূরা তালাকের ৪নং আয়াতের দিকে লক্ষ্য করি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,
‘তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ঋতুবর্তী হওয়ার আশা নেই, তাদের ব্যাপারে সন্দেহ হলে তাদের ইদ্দত হবে তিন মাস। আর যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি, তাদেরও অনুরূপ ইদ্দতকাল হবে। গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাকে ভয় করে, আল্লাহ তার কাজ সহজ করে দেন।’ (সূরা তালাক-৪)
উল্লে­খিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে,
বালেগা নারীদের ক্ষেত্রে ইদ্দত কাল হবে তিন মাসিক বা তিন রজস্রাব
নাবালেগা নারীদের ক্ষেত্রে ইদ্দত কাল হবে তিন মাস
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল হবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত
উপরোক্ত সূরা তালাকের তিনটি আয়াত বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই যে, স্পষ্ট নির্লজ্জ কাজ পরিলক্ষিত না হলে স্ত্রীকে তালাক দেয়া যাবে না। আর তালাক দিলে সেক্ষেত্রে তিনটি ইদ্দত তথা মাসিক অপেক্ষা করতে হবে। প্রথম মাসে তালাক দিবে, যদি এর মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মিল হয়ে যায় তবে তারা পুনরায় সংসার করবে। আর যদি মিল না হয় তবে দ্বিতীয় মাসে তালাক দিবে এবং অপেক্ষা করবে। যদি এবার মিল হয়ে যায় তবে সংসার করবে অথবা তৃতীয় মাসে পুনরায় তালাক দিবে।

তৃতীয় মাস পূর্ণ হলে তারা যদি মনে করে সংসার করবে অথবা বিচ্ছিন্ন হবে তাহলে দুজন স্বাক্ষী রেখে চূড়ান্ত ফয়সালা করবে। অর্থাৎ সংসার করলেও দুজন স্বাক্ষী রাখবে এবং বিচ্ছেদ ঘটালেও স্বাক্ষী রাখবে। তিন ইদ্দতকাল সময় অপেক্ষা করার মধ্যে হেকমত লুকিয়ে আছে। কেননা নারী যদি গর্ভবতী হয়ে যায় তবে এ তিন মাসের মধ্যেই বোঝা যাবে। আর গর্ভবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল হবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। অর্থাৎ তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পর যদি সন্তান প্রসব না হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সুবহানআল্লাহ! আল্লাহর কি অপার করুনা। সন্তান প্রসবের পরে যদি সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে স্বামী-স্ত্রীর মিল হয়ে যায় তাই গর্ভবতীদের জন্য আল্লাহ প্রসব পর্যন্ত ইদ্দতকাল নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।

এখন সূরা বাকারা ২২৮নং আয়াত লক্ষ্য করি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন-
‘আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন হায়েয পর্যন্ত। আর যদি সে আল্লাহ প্রতি এবং আখেরাত দিবসের ওপর ঈমানদার হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ যা তার জরায়ুতে সৃষ্টি করেছেন তা লুকিয়ে রাখা জায়েয নয়। আর যদি সদ্ভাব রেখে চলতে চায়, তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে নেবার অধিকার তাদের স্বামীরা সংরক্ষণ করে। আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের ওপর নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আর আল্লাহ হচ্ছে পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা-২২৮)

উল্লে­খিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে,
এ আয়াতে তালাকের জন্য নারী তিন হায়েজ বা রজঃস্রাব পর্যন্ত অপেক্ষা করবে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে
তালাকপ্রাপ্তা নারী তিন মাস অপেক্ষা করে অর্থাৎ চূড়ান্ত তালাকের পরে অন্য কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে
তাৎক্ষনিক তালাক ও তাৎক্ষনিক বিবাহ সম্পুর্ণ কুরআন বিরোধী
তিন মাসের মধ্যে জরায়ুতে যা সৃষ্টি হয়েছে তথা গর্ভবতী হলে তা প্রকাশ পাবে
তিন মাসের মধ্যে যদি সদ্ভাব রেখে চলতে চায় তবে পুনরায় সংসার করতে পারে
তালাকের ব্যাপারে পুরুষদের যেমন অধিকার আছে নারীদের ক্ষেত্রেও অধিকার আছে
এখন সূরা বাকারা ২২৯নং আয়াত লক্ষ্য করি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন-
“তালাকে- ‘রজঈ’ হলে দুবার পর্যন্ত- তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে বর্জন করবে। আর নিজের দেয়া সম্পদ থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের জন্য জায়েয নয় তাদের কাছ থেকে।

কিন্তু যে ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই এ ব্যাপারে ভয় করে যে, তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, অতঃপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে, তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সেক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয়, তবে উভয়ের মধ্যে কারোরই কোন পাপ নেই। এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা। কাজেই একে অতিক্রম করো না। বস্তুত যারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে, তারাই হলো জালিম।” (সূরা বাকারা-২২৯)

উল্লে­খিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে যে,
নিময় অনুযায়ী তালাক সম্পূর্ণ করতে হবে অর্থাৎ তিন ইদ্দত শেষ করে তালাক চূড়ান্ত করতে হবে (তাফসীরে জালালাইন শরীফে উক্ত আয়াতের ব্যখ্যায় তিন হায়েজে তালাক সম্পূর্ণের কথা বলা আছে)
তালাকে রজঈ অর্থাৎ দুই তালাক তথা দুই ইদ্দত পালনের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবে
স্ত্রীকে দেয়া সম্পদ (দেন মোহর) ফিরিয়ে নেয়া নাজায়েজ
কোন ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি ধন-সম্পদের বিনিময়ে তালাক নেয়, সেটাও জায়েজ। স্ত্রী যদি ধন-সম্পদের বিনিময়ে স্বামীর নিকট থেকে তালাক নেয়, তবে তাকে খুলআ তালাক বলে।
এখন সূরা বাকারা ২৩১নং আয়াত লক্ষ্য করি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন-
“আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও, অতঃপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও, অথবা সহানুভূতির সাথে তাদেরকে মুক্ত করে দাও। আর তোমরা তাদেরকে জ্বালাতন ও বাড়াবাড়ি করার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না। আর যারা এমন করবে, নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে।” (সূরা বাকারা-২৩১)
। উক্ত আয়াতের দ্বারা ইসলাম পুরুষকে সর্বমোট ৩ দফা তালাক দেয়া বাধ্যবাধকতার মধ্যে নিয়ে আসে, যাতে কেউ আর নারীকে নিয়ে তালাক তালাক খেলা খেলতে না পারে।
আবার কোন নারীকে স্পর্শ করার পূর্বেই (বাসর রাতের পূর্বে) তালাক দেয়া হলে তার কোন ইদ্দত পালনের প্রয়োজন নেই। যেমন আল্লাহ এরশাদ করেন-
‘হে আমানুগণ! তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে বিবাহ কর, অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তখন তাদের ইদ্দত পালনে বাধ্য করার অধিকার তোমাদের নেই। অতঃপর তোমারা তাদেরকে কিছু দেবে এবং উত্তম পন্থায় বিদায় দেবে।” (সূরা আহযাব-৪৯)
যাহোক, সূরা বাকারার আয়াতেও তালাকের ব্যাপারে স্পষ্টতা ফুটে উঠেছে। তা সূরা তালাকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

যেখানে কুরআন শরীফে তালাকের ব্যাপারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, সেখানে হাদিস শরীফ অনুসন্ধান না করলেও চলে। কেননা হাদিস দিয়ে কুরআনের আয়াত বাতিল করা যায় না। বরং কুরআনের আয়াত দিয়ে হাদিস বাতিল করা যায়। তবে আরও অধিক বোঝার স্বার্থে হাদিস শরীফ অনুসন্ধান করা যায়, যদি তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সহায়ক হয়। এবার দেখি তালাক সম্পর্কে হাদিস শরীফ কি বলে।
১. হাদিস শরীফে উলে­খ আছে, রাগের বশবর্তী হয়ে অর্থাৎ রাগের মাথায় তালাক দিলে তা তালাক বলে গণ্য হবে না।
যেমন আবু দাউদ শরীফের কিতাবুত তালাক অধ্যায়ের ‘বাবু ফিত তালাক্বি আ’লা গাইজী’ অর্থাৎ ‘রাগান্বিত অবস্থায় তালাক দেয়া’ অনুচ্ছেদে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিস শরীফটি নিম্নরুপঃ
অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে উবায়দ ইবনে আবু সালিহ (র) হতে বর্ণিত, যিনি (সিরিয়ার) ইলিয়া নামক স্থানে বসবাস করতেন। তিনি বলেন, আমি সিরিয়া হতে আদী ইবনে আলী আল কিন্দীর সাথে বের হই। এরপর আমরা মক্কায় উপনীত হলে, আমাকে সাফিয়্যা বিনতে শায়বার নিকট তিনি প্রেরণ করেন। যিনি আয়শা (রা) হতে এ হাদিসটি সংগ্রহ করেন।

রাবী বলেন, আমি আয়শা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ গিলাক অবস্থায় কোন তালাক হয় না বা দাস মুক্ত করা যায় না। ইমাম আবু দাউদ (র) বলেন, গিলাক অর্থ রাগান্বিত অবস্থায় তালাক প্রদান করা। (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৯১ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

২. এছাড়া নিদ্রিত ও উন্মাদ (নেশাগ্রস্থ বা রোগগ্রস্থ) অবস্থায় তালাক হয় না। (সুনানু নাসাই শরীফ-৩য় খন্ড,-৩৪৩৩ নং হাদিস এবং সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ-২য় খন্ড-২০৪১, ২০৪২ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৩. তালাক হায়েজ তথা রজঃস্রাবের সাথে সম্পর্কিত। এ সম্পর্কে আবু দাউদ শরীফের কিতাবুত তালাক অধ্যায়ের ‘সুন্নত তরিকায় তালাক’ অনুচ্ছেদে উল্লে­খ আছে, “আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে তাঁর স্ত্রীকে হায়েজ (রজঃস্রাব) অবস্থায় তালাক প্রদান করেন। তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এ ব্যাপার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তুমি তাকে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে বল এবং হায়েজ হতে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখতে বল।

এরপর সে পুনরায় হায়েজ এবং পুনরায় হায়েজ হতে পবিত্র হলে সে তাকে চাইলে রাখতেও পারে এবং যদি চায় তাকে তালাক দিতে পারে, এই তালাক অবশ্য তার সাথে সহবাসের পূর্বে পবিত্রাবস্থায় দিতে হবে। আর এ ইদ্দত আল্লাহ তায়ালা নারীদের তালাক প্রদানের জন্য নির্ধারিত করেছেন।” (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৭৬ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

৪. আবু দাউদ শরীফের কিতাবুত তালাক অধ্যায়ে ‘আলবাত্তাতা’ অর্থাৎ এক শব্দে তিন তালাক প্রদান করা বিষয়ে উল্লেখিত আছে, “নাফি ইবনে উজায়র ইবনে আবদ ইয়াযীদ ইবনে রুকানা (রা) হতে বর্ণিত। রুকানা ইবনে আবদ ইয়ায়ীদ তাঁর স্ত্রী সুহায়মাকে ‘আলবাত্তাতা’ (এক শব্দে তিন তালাক) শব্দের দ্বারা তালাক প্রদান করে। তখন এতদসম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অবহিত করা হয়। তখন তিনি বলেন, আল্লাাহর শপথ! আমি এর দ্বারা এক তালাকের ইচ্ছা করি।

তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, আল্লাহর শপথ, তুমি কি এর দ্বারা এক তালাকের ইচ্ছা করেছ? তখন জবাবে রুকানা বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি এর দ্বারা এক তালাকের ইচ্ছা করি। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে স্বীয় স্ত্রী পুনরায় গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। অতঃপর তিনি উমার (রা) এর খিলাফতকালে তাকে দ্বিতীয় তালাক দেন এবং তৃতীয় তালাক প্রদান করেন উসমান (রাঃ) এর খিলাফত কালে।” (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২২০৩ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

একসাথে তিন তালাক উচ্চারণকে ইসলামী শরিয়ার পরিভাষায় তালাকে বিদা বলে। একসাথে তিন তালাক উচ্চারণে তালাক হবে এ ধরণের কোন আইন নবীজি (সাঃ) এর সময়ে ছিল না। আসলে শারিয়ার এ আইন বানানো হয়েছে নবীজীর অনেক পরে। এ কথা বলেছেন কিছু বিশ্ববিখ্যাত শারিয়া-সমর্থকরাই।

যেমন, “নবীজীর ওফাতের বহু পরে তালাকের এক নূতন নিয়ম দেখা যায়। স্বামী একসাথে তিন-তালাক উচ্চারণ করে বা লিখিয়া দেয়। এই তালাকে অনুতাপ বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ নাই। অজ্ঞ মুসলমানেরা এইভাবে গুনাহ্ করে। নবীজী তীব্রভাবে ইহাতে বাধা দিয়াছেন” (সূত্রঃ বিশ্ব-বিখ্যাত শারিয়াবিদ ডঃ আবদুর রহমান ডোই-এর “শারিয়া দি ইসলামিক ল’ পৃঃ ১৭৯)।

“নবীজীর সময় থেকে শুরু করে হজরত আবু বকর ও হজরত ওমরের সময় পর্যন্ত একসাথে তিন-তালাক উচ্চারণকে এক-তালাক ধরা হত। কিন্তু যেহেতু লোকে তাড়াতাড়ি ব্যাপারটার ফয়সালা চাইত তাই হজরত ওমর একসাথে তিন-তালাককে বৈধ করেন এবং এই আইন চালু করেন” (সূত্রঃ আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৯৬নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মুসলিম শরীফ, ৫ম খন্ড, ৩৫৩৮ নং হাদিস, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার)। এখানে দেখা যায় যে, নবীজি (সাঃ) এর আইনের সাথে হযরত উমর (রাঃ) এর আইনের অমিল দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হতে পারে আমরা কার আইন মান্য করবো? সোজা উত্তর নবীজি (সাঃ) এর অর্থাৎ একসাথে তিন তালাককে এক তালাক ধরবো। কেননা নবীজি (সাঃ) এক সাথে তিন তালাক অপছন্দ করতেন। যেমন-

(ক) “এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন-তালাক একসাথে দিয়েছে শুনে রাসূল (সাঃ) রাগে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের প্রতি ঠাট্টা করছ? অথচ আমি এখনও তোমাদের মধ্যেই রয়েছি ! অনেকে এ হাদিসকে মুসলিম শরিফের সূত্রে সঠিক বলেছেন” (সূত্রঃ মওলানা মুহিউদ্দীনের বাংলা-কোরাণের তফসির পৃঃ ১২৮; মাওলানা আশরাফ আলী থানভী’র “দ্বীন কি বাঁতে” পৃঃ ২৫৪ আইন #১৫৩৭, ১৫৩৮, ১৫৪৬ ও ২৫৫৫)।

(খ) “এক সাহাবি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন-তালাক বলেছে শুনে রসুল (দঃ) বললেন ‘এই তিন তালাক মিলে হল এক-তালাক। ইচ্ছে হলে এই তালাক বাতিল করতে পার।’ (সূত্রঃ বিশ্ব-বিখ্যাত শারিয়া-সমর্থক মওলানা ওয়াহিদুদ্দিনের “Women in Islami Sharia”-তে ফতহুল বারী’র সূত্রে – পৃঃ ১০৮ ও ১০৯)

৫. ইমাম আবু দাউদ (র) বলেন, ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, “যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক প্রদান করবে তাতে এক তালাকাই হবে।” (আবু দাউদ শরীফ, ৩য় খন্ড, ২১৯৪ নং হাদিস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
নবীজি তিন একসাথে তিন তালাককে এক তালাক ধরেছেন এবং পরবর্তীতে উমর (রা) তিন তালাককে তিন তালাকই বলে সাবস্ত্য করেছেন। ফলে তাৎক্ষণিক-তালাকে বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে কি করতে হবে তা ইমাম শাফি’(র) বলেছেন: “পরস্পর-বিরোধী দুইটি হাদিসের মধ্যে কোন্টি বেশি নির্ভরযোগ্য তাহার বিচার অন্য সুন্নত দ্বারা বা কোরাণ দ্বারা হইবে” (সূত্রঃ ইমাম শাফি’র বিখ্যাত কেতাব “রিসালা” পৃঃ ১৮২, এটিকে সমস্ত শারিয়া বিজ্ঞানের মূল কেতাব বলে ধরা হয়)
যেহেতু একসাথে তিন তালাক উচ্চারনে নিরুৎসাহিত করা,

কঠোরভাবে নিষেধ করা এবং সেটাকে এক তালাক হিসাবে গণ্য করাটাকেই অনেক বেশি সুন্নাহর কাছাকাছি। তাই আমার নবীজি (সাঃ) এর সুন্নাহ অনুসরণ করবো অর্থাৎ একসাথে তিন তালাক উচ্চারণকে এক তালাক হিসেবে সাব্যস্ত করবো। ইহাই নবীজি (সাঃ) এর আইন। খ বিশ্লেষন করে মুসলিম বিশ্ব

উপরিউক্ত আয়াতটি মনে রাখবেন, আয়াতটি নিয়ে পরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করব- ইনশাআল্লাহ!

আচ্ছা, এখন একটা প্রশ্ন হতে পারে-“তালাকের বিষয়ে ইসলাম কি মনে করে”?? ইসলাম চায়- সমাজে তালাকের মত নিকৃষ্ট ঘটনা না ঘটে এবং তার জন্য ইসলাম প্রয়োজনীয় ব‍্যাবস্থাও গ্ৰহণ করেছে। ইসলাম কি কি ব‍্যাবস্থা গ্ৰহণ করেছে??

এ বিষয়ে পরে আসছি কিন্তু তার আগে দেখে নিতে চাই-“সমাজে তালাকের মত নিকৃষ্ট ঘটনা ঘটে কেন”??

বিবাহ জীবনে স্বামী ও স্ত্রী একে-অপরের প্রতি রাগ করা এবং একে-অপরকে ক্ষমা না করা- এটাই হল তালাকের মত নিকৃষ্ট ঘটনা ঘটার অন‍্যতম কারণ। আর, এই ব‍্যাপারেই আল্লাহ 3:134 একটি বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন, এভাবে-

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

অনুবাদ হবে এমন-“যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থাতেই (আল্লাহর পথে) অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়। এই ধরনের সৎ লোকদের আল্লাহ‌ অত্যন্ত ভালোবাসেন”(3:134)।

3) স্বামী ও স্ত্রীর একে-অপরের প্রতি অনীহা এবং অন্য নারী ও পুরুষের প্রতি আকর্ষণ- তালাকের মত নিকৃষ্ট ঘটনা ঘটার অন‍্যতম কারণ। এক কথায় বললে বলা ভাল যে- “পরকীয়া” তালাকের অন‍্যতম প্রধান কারণ গুলোর একটা। আর, এ বিষয়ে আল্লাহ কোরানে বলেছেন-

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

অনুবাদ হবে এমন-“তোমরা ব‍্যাভিচারের কাছেও যেও না, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ ও খুবই জঘন্য পথ”(17: 32)। উপরিউক্ত আয়াত শুধুমাত্র ব‍্যাভিচারকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নি, বরং পাশা-পাশি যে কাজ করলে অবৈধ সম্পর্ক তৈরী সেই সমস্ত কাজকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে!!

স্বামী-স্ত্রী একে-অপরকে একে-অপরের সমান না ভেবে একে-অপরকে ছোট ভাবা।

যদিও ইসলাম এমনটা মোটেও ভাবে না!! 

যাইহোক, যদি আমরা পুরো-পুরি ইসলাম মেনে চলি, তাহলে হয়ত তালাকের প্রয়োজনইইইই পড়বে না!! এই জন‍্যেই আল্লাহ কোরানে বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً 

অনুবাদ হবে এমন-“হে ঈমানদারগণ!! তোমরা পুরো-পুরি ভাবে ইসলামে প্রবেশ কর”(2:208)।

সুধীপাঠক, এবার আমরা সঠিক তালাক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব- ইনশাআল্লাহ। আমাদের আলোচনা যেন কোরান ও হাদীস কেন্দ্রিক রাখতে পারি!! চলুন-

ধরুন- আপনার স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি রয়েছে এবং এ জন্যে মাঝে-মাঝেই আপনাদের সংসারে অশান্তি হয় এবং আপনি রোজ-রোজ এই অশান্তিতে বিরক্ত হয়ে গেছেন এবং আপনি এই অশান্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে চাইছেন!! এখন আপনি আপনার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইছেন। কিন্তু তালাক দেওয়া বললেই তো আর তালাক দেওয়া নয়!! তার আগে কিছু প্রক্রিয়া আছে, সেগুলো পালন করতে হবে। যেমন-

1) স্ত্রীকে সদুপদেশ দিতে হবে তথা বোঝাতে হবে।

2) যদি তাতেও না হয়, তখন স্ত্রীকে থেকে বিছানা আলাদা করে দিতে হবে।

3) যদি তাতেও না হয়, তখন পুরো-পুরি স্ত্রী-সঙ্গ ত‍্যাগ করতে হবে।

4) যদি তাতেও না হয়, তখন স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন করে সালিশ নিযুক্ত করে স্বামী-স্ত্রীকে সংশোধনের জন্য চেষ্টা করতে হবে।

5) যদি তাতেও না হয়, সেক্ষেত্রে আর কোনও পথইইইই খোলা থাকল না!! তখন অশান্তি এড়াতে বিবাহ বিচ্ছেদের পথইইইই খোলা থাকে অর্থাৎ তালাক!! কারণ, এ বিষয়ে কোরান বলে- وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ 

অনুবাদ হবে এমন-“ফিতনা বা অশান্তি হত‍্যার চেয়েও বেশি মারাত্মক”(2:191)।

বলে রাখা ভাল হবে যে- এই প্রক্রিয়ায় কোনও ভাবেই স্ত্রীকে কোনও রুপ মারধোর করা যাবে না। এখানে কেউ কেউ 4:34 আয়াত তুলে ধরে বলতে পারেন যে- এই আয়াতে স্ত্রীকে প্রহার বা মারের কথা বলা হয়েছে!! 

যাইহোক, উপরিউক্ত সমস্ত প্রক্রিয়া যদি অসফল হয়, তখন আর অন্য কোনও উপায় থাকল না- একমাত্র উপায় তালাক ছাড়া!! কিন্তু তালাক হবে কিভাবে বা কোন পদ্ধতিতে?? চলুন বর্ণনা করি-

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ ۖ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ ۚ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ ۚ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَٰلِكَ أَمْرًا

অনুবাদ হবে এমন-“হে নবী, তোমরা যখন স্ত্রীলোকদের তালাক দেবে, তাদেরকে তাদের ইদ্দতের জন্য তালাক দাও এবং ইদ্দতের সময়টা ঠিকমত গণনা কর ,আর তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় কর (ইদ্দত পালনের সময়ে) তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী থেকে বের করে দিও না। তারা নিজেরাও যেন বের না হয়। তবে, তারা যদি স্পষ্ট অশ্লীল কাজ করে, তবে ভিন্ন কথা। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে আল্লাহর সীমাসমূহ লংঘন করবে সে নিজেই নিজের ওপর জুলুম করবে। তোমরা জান না আল্লাহ‌ হয়তো এর পরে সমঝোতার কোন উপায় সৃষ্টি করে দেবেন”(65:1)।

উপরিউক্ত আয়াত থেকে বোঝা গেল তালাক দিতে চাইলে ইদ্দতের জন্য তালাক দিতে হবে। অর্থাৎ প্রতি মাসে একটি করে 3 মাসে 3 তালাক দিতে হবে। অর্থাৎ এ ভাবে ঘটবে-

ধরুন- আপনি আপনার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইছেন এবং আপনি জানুয়ারি মাসের 15 তারিখে স্ত্রীকে 1 তালাক দিয়েছেন। এই 1 তালাক দেওয়ার পর যদি আপনার স্ত্রী তার দোষ-ত্রুটি সংশোধন করে নেয় তো ভাল, নয়ত তারপর আপনার স্ত্রীর এক বার ঋতুস্রাব বা মাসিক হতে হবে। আপনার স্ত্রীর ঋতু বা মাসিক শেষ হওয়ার পর ফেব্রুয়ারির 15 তারিখে স্ত্রীকে আরও 1 তালাক দিতে পারবেন। যদি এখনও আপনার স্ত্রী তার দোষ-ত্রুটি সংশোধন করে নেয় তো ভাল, নয়ত তারপর আপনার স্ত্রীর আরও একবার ঋতুস্রাব বা মাসিক হবে এবং ঋতুস্রাব বা মাসিক শেষ হওয়ার পর মার্চ মাসের 15 তারিখে স্ত্রীকে আরও 1 তালাক দিতে পারবেন।

এই তালাক আপনি বন্ধ ঘরে দিতে পারবেন না, 2 জন সাক্ষীর সামনে স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। কোরানে আল্লাহ বিষয়টি বলেছেন এভাবে-

فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ فَارِقُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ وَأَشْهِدُوا ذَوَيْ عَدْلٍ مِنْكُمْ وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ يُوعَظُ بِهِ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا

অনুবাদ হবে এমন-“এর পর তারা যখন তাদের (ইদ্দতের) সময়ের সমাপ্তির পর্যায়ে পৌঁছবে তখন হয় তাদেরকে ভালভাবে (বিবাহ বন্ধনে) আবদ্ধ রাখো নয় ভালভাবেই তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাও। এমন দুই ব্যক্তিকে সাক্ষী বানাও, তোমাদের মধ্যে যারা ন্যায়বান। হে সাক্ষীরা, আল্লাহর জন্য সঠিকভাবে সাক্ষ্য দাও। যারা আল্লাহ‌ ও আখেরাতের দিনের প্রতি ঈমান পোষণ করে, তাদের জন্য উপদেশ হিসেবে এসব কথা বলা হচ্ছে। যে ব্যক্তিই আল্লাহকে ভয় করে চলবে আল্লাহ‌ তার জন্য কঠিন অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় সৃষ্টি করে দেবেন”(65:2)।

উপরিউক্ত 65:2 আয়াত হতে বোঝা গেল- 2 জন সাক্ষীর সামনে প্রতি মাসে 1 টি করে 3 মাসে 3 তালাক দিতে হবে। মনে রাখা দরকার যে, 65:1 আয়াতে বলা হচ্ছ-

لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ

অনুবাদ হবে এমন-“তোমরা তাদেরকে (স্ত্রীদেরকে) বাড়ি থেকে বের করে দেবে না, আর নিজেরাও বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে না- অবশ্য স্ত্রী যদি প্রকাশ‍্য অশ্লীল কাজ করে, তবে ভিন্ন কথা”।

উপরিউক্ত আয়াত হতে এটা পরিষ্কার বোঝা গেল যে, স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে, স্ত্রীর সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। দূর থেকে চিঠির মাধ্যমে, ম‍্যাসেজের মাধ্যমে, মোবাইলে কথা বলতে বলতে তালাক দেওয়া যাবে না!!

যাইহোক, এবার ধরুন- 3 মাসে 3 তালাক হওয়ার পর স্ত্রী তার বাপের বাড়িতে চলে গেল!! কিন্তু তারপরও যদি স্ত্রী নিজেকে সংশোধন করতে চায়, সেক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীকে আবার ফিরিয়ে নিতে পারবে, আবার তারা একত্রে স্বামী-স্ত্রী হয়ে জীবন-যাপন করতে পারবে। এই বিষয়টি আল্লাহ কোরানে বলেছেন এভাবে-

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ ۚ وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَنْ يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِنْ كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَٰلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا ۚ وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

অনুবাদ হবে এমন-“তালাক প্রাপ্তা নারীগণ 3 মাসিক ঋতুস্রাব পর্যন্ত অপেক্ষা করবে (অর্থাৎ অন্য কোনও পুরুষকে বিবাহ করবে না)। আর, আল্লাহ‌ তাদের গর্ভাশয়ে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তাকে গোপন করা তাদের জন্য বৈধ নয়। তাদের কখনও এমনটি করা উচিত নয়, যদি তারা আল্লাহ‌ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়, তাদের স্বামীরা পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত হয়, তাহলে তারা এই অবকাশ কালের মধ্যে তাদেরকে নিজের স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নেবার অধিকারী হবে। নারীদের জন্যও ঠিক তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে, যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের উপর। তবে, পুরুষরা নারীদের তুলনায় শারীরিক শক্তি সম্পন্ন। আর, সবার ওপরে আছেন আল্লাহ‌ সর্বাধিক ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের অধিকারী, বিচক্ষণ এবং জ্ঞানী”(2:228)।

ধরুন- এই বাড়তি 3 মাসের মধ্যে আপনি আপনার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলেন এবং সংসার করতে থাকলেন!! পরে যদি আবার আপনার স্ত্রীর দোষ-ত্রুটির কারণে আপনার সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং আপনার স্ত্রী তার দোষ-ত্রুটি সংশোধন করতে চাইছে না, সেক্ষেত্রে আবার পূর্বে বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী তালাক হবে এবং আপনারা অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যাবেন!!

ধরুন- তারপর আবার আপনি 3 মাস বাড়তি সময় পাবেন স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং আপনি এই বাড়তি 3 মাসের মধ্যে স্ত্রীকে আবার ফিরিয়ে আনলেন এবং পুনরায় স্বামী-স্ত্রী হিসাবে জীবন-যাপন শুরু করলেন!!

ধরুন- আবার আপনাদের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে আপনার স্ত্রীর কারণে, সেক্ষেত্রে পূর্বে বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী আবার তালাক দিলেন এবং আপনারা অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী আবার আলাদা হয়ে গেলেন!! ★★এর পর আপনারা পুনরায় মিলিত হতে চাইলে আর মিলিত হতে পারবেন না!! কারণ, বিবাহ কোনও ছেলে খেলা বা পুতুল খেলা নয়!! এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহ বলেছেন এভাবে-

فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

অনুবাদ হবে এমন-“অতপর যদি স্বামী তৃতীয়বার স্ত্রীকে তালাক দেয়, অন্য স্বামীর সঙ্গে বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত গত স্বামী তার জন্য হালাল নয়। পরে যদি বর্তমান তাকে তালাক দেয় এবং উভয়ে (গত স্বামী ও স্ত্রী) আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষা করতে পারবে বলে মনে করে, তবে প্রত‍্যবর্তনে কোনও পাপ নেই। এটাই আল্লাহর সীমা, যা জ্ঞানীদের জন্য আল্লাহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন”(2:230)।

ইসলামে বিবাহ খুব এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন‍্যেই স্বামী-স্ত্রীকে সংসার জীবন-যাপন করার জন্য অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছে!! তাই নয় কি?? যাইহোক, এবার আমরা সংক্ষিপ্ত ভাবে সেই সমস্ত দিক গুলো আলোচনা করব, যে সমস্ত দিক লেখার সৌন্দর্যের স্বার্থে বাদ দিতে হয়েছিল-

1) স্বামী যদি তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, স্ত্রীকে “মোহর” হিসাবে যা দেওয়া হয়েছিল- তা স্বামী ফেরত চাইতে পারবে না!

যাইহোক, স্বামী তালাকের পদক্ষেপ নিলে “মোহর” হিসাবে ধার্যকৃত অর্থ ফেরত নেওয়া যায় না, এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহ বলেছেন এভাবে-

وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا ۚ أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا

অনুবাদ হবে এমন-“আর, তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্ৰহণ করার সংকল্প করেই থাকো, তাহলে তোমরা তাকে (আগের বা তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীকে) সম্পদের পাহাড় দিয়ে থাকলেও, তা থেকে কিছুই ফিরিয়ে নিও না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এবং সুস্পষ্ট জুলুম করে তা ফিরিয়ে নেবে”(4:20)??

2) 3 মাসে 3 তালাক হওয়ার স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যাবে এবং স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য বাড়তি 3 মাস সময় পায় এবং এই অবকাশ কালের মধ্যে যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে চায়, ফিরিয়ে আনতে পারবে কিন্তু যদি স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে আর থাকতে না চায়, সেক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীকে জোর করে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহ বলেছেন এই ভাবে- لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ অনুবাদ হবে এমন-“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই”(2:256)।

3) আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (স) বলেছেন- তালাক মাত্রই তা কার্যকর হয়, বুদ্ধিভ্রষ্ট ও মতিভ্রম লোকের তালাক কার্যকর হয় না”(তিরমিযী, কিতাবুত তালাক, হাদীস 1131)। অর্থাৎ যদি কেউ মদ খেয়ে অথবা নেসাগ্ৰস্থ অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়, সেই তালাক গ্ৰহণ যোগ্য হবে না।

শুধুমাত্র এখানেই শেষ নয়, স্ত্রীর যদি Period বা ঋতু স্রাব বা মাসিক হয়- এই অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যাবে না। নিচের বর্ণিত হাদীসটি দেখুন-

“আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বর্ণনা করেছেন যে, তিনি নবী (স) জীবদ্দশায় তার স্ত্রীকে ঋতুবতী অবস্থায় 1 তালাক দিলে তার পিতা উমার ইবনে খাত্তাব (রা) নবী (স)- কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন নবী ( স) বললেন- তাকে (তোমার ছেলেকে) গিয়ে বল যে, সে যেন তার স্ত্রীকে স্ত্রী হিসাবে ফিরিয়ে নেয়”(বুখারী, কিতাবুত তালাক, হাদীস 4871)। এখানেই কিন্তু শেষ নয়, আরও একটু বাকি আছে। নিচের হাদীসটি দেখুন-

“আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিশ্বনবী (স) বলেছেন- গিলাক বা রাগ অবস্থায় তালাক বা দাস মুক্তি হয় না”(আবুদাউদ, কিতাবুত তালাক, হাদীস 2191)।

4) 3 বার বিচ্ছেদ হওয়ার পর আপনি স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে আনতে পারবেন না এবং আপনার স্ত্রী চাইলেও আপনার কাছে আর ফিরে আসতে পারবে না এবং আপনার গত স্ত্রী যদি অন্য জায়গায় বিয়ে করতে চায়, তখন আপনি সেই বিয়েতে বাধা দিতেও পারবেন না। এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহ বলেছেন এভাবে-

وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يَنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ إِذَا تَرَاضَوْا بَيْنَهُمْ بِالْمَعْرُوفِ

অনুবাদ হবে এমন-“তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের তালাক দেয়ার পর যখন তারা ইদ্দত পূর্ণ করে নেয়, তখন তাদের নিজেদের প্রস্তাবিত স্বামীদের সাথে বিয়ের ব্যাপারে তোমরা বাধা দিও না, যখন তারা প্রচলিত পদ্ধতিতে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্মত হয়”(2:232)।

5) প্রথমবার 3 মাসে 3 তালাক হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হওয়ার পর, যদি স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সম্মত না হয়ে সংসার জীবন-যাপন করতে চাইবে, ততক্ষণ স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না!! আর, যদি স্বামী স্ত্রীকে 3 মাসের মধ্যে ফিরিয়ে না আনে, সেক্ষেত্রে স্ত্রী অন্য কোনও পুরুষকে বিবাহ করতে পারে।

6) তবে, যদি স্ত্রী 3 মাস পরও অন্য কোনও পুরুষকে বিবাহ না করে, সেক্ষেত্রে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে এনে পুনরায় সংসার জীবন-যাপন করতে পারবে।

7) 3 বার বিচ্ছেদের পর স্বামীর কাছে আর কোনও সুযোগ থাকল না স্ত্রীকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য!! তখন স্ত্রী হয়ত অন্য কোনও পুরুষকে বিবাহ করে নিল এবং স্ত্রীর বর্তমান স্বামীও যদি পূর্বে বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী স্ত্রীকে তালাক দেয়, সেক্ষেত্রে স্ত্রী তার পূর্ব স্বামীর কাছে ফিরতে পারবে। এটা অবশ্য এবং অবশ্যই কাকতলীয় ঘটনা হতে হবে, কোনও পরিকল্পনা হলে হবে না!! এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহ বলেছেন এভাবে-

فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

অনুবাদ হবে এমন-“অতপর যদি স্বামী তৃতীয়বার স্ত্রীকে তালাক দেয়, অন্য স্বামীর সঙ্গে বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত গত স্বামী তার জন্য হালাল নয়। পরে যদি বর্তমান তাকে তালাক দেয় এবং উভয়ে (গত স্বামী ও স্ত্রী) আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষা করতে পারবে বলে মনে করে, তবে প্রত‍্যবর্তনে কোনও পাপ নেই। এটাই আল্লাহর সীমা, যা জ্ঞানীদের জন্য আল্লাহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন”(2:230)।

বলে রাখতে চাই যে, উপরিউক্ত 2:230 আয়াতকে মানুষ পরিকল্পিত ভাবে অসৎ উদেশ‍্যে ব‍্যবহার করে। বিশেষ করে “হালালা বা হিল্লা বিবাহের” ক্ষেত্রে। এই 2:230 আয়াতের অপব্যবহার হবে বলেই হয়ত আল্লাহ 2:231 আয়াতে আল্লাহ মানুষকে সাবধান করেছেন এভাবে- وَلَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا অনুবাদ হবে এমন-“তোমরা আল্লাহর আয়াতকে নিয়ে ছেলে-খেলা কর না”(2:231)।

★ সুধীপাঠক, এতক্ষণ আমরা স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি মেনে নিয়ে সঠিক তালাক পদ্ধতি বর্ণনা করেছি কিন্তু স্ত্রী যদি কোনও পুরুষকে তালাক দিতে চায় অথবা স্বামীর থেকে “খুলা তালাক” নিতে চায়, সেক্ষেত্রে পুরুষের মধ্যে দোষ-ত্রুটি থাকা জরুরী নয়। 

সুধীপাঠক, এবার আমরা “খুলা” সম্পর্কে আলোচনা করব- ইনশাআল্লাহ।

যাইহোক, “খুলা তালাক” বলতে কি বোঝায়?? এক কথায়, স্বামী বিবাহের সময় স্ত্রীকে যে মোহর দেয়, স্ত্রী তা স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে স্বামীর থেকে তালাক নেওয়া!! এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহ বলেছেন এভাবে- 

فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ۚ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

অনুবাদ হবে এমন-“তাহলে স্ত্রীর কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামীর থেকে বিচ্ছেদ লাভ করায় কোনও ক্ষতি নেই। এগুলো আল্লাহ‌ নির্ধারিত সীমারেখা, এগুলো অতিক্রম কর না। মূলত যারাই আল্লাহ‌ নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করবে, তারাই জালেম”(2:229)।

অর্থাৎ বিষয়টি আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম। আপনি হয়ত খেয়াল করেন নি, আর তা হল- স্বামী যদি তালাকের উদ্যোগ নেয়, তাহলে মোহরের পরিমাণ সোনার পাহাড় হলেও স্বামী তা হতে কিছুই ফেরত নিতে পারবে না। কিন্তু তালাকের উদ্যোগ যদি স্ত্রী নেয়, তাহলে মোহর হিসাবে ধার্যকৃত সম্পদ স্বামীকে ফেরত দিয়ে তালাক নিতে হবে!!

সুধীপাঠক, এবার আপনাদের সামনে একটি হাদীস উদ্ধৃতি করি, তাহলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে আপনার কাছে। হাদীসটি দেখুন-

“ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাবিত ইবনে কায়িস ইবনে সাম্মাসের স্ত্রী (জামিলা) নবী (স)- এর নিকট এসে বলল- হে আল্লাহর রাসুল (স), আমি (আমার স্বামী) সাবিতের ধর্মপরায়ণতা বা চরিত্রগত কারণে তার সঙ্গে সংসার করতে অস্বীকার করি না, কিন্তু আমি কুফরীর ভয় করি। তখন নবী (স) তাকে বললেন- তুমি (মোহর হিসাবে পাওয়া) তার বাগানটি তাকে ফিরিয়ে দিতে রাজি আছ?? তখন সে (জামিলা) বলল- হ‍্যাঁ। ফলতঃ নবী (স) সাবিতকে নির্দেশ দিলেন যে, তাকে (অর্থাৎ জামিলাকে বা তোমার স্ত্রীকে) 1 (এক) তালাক দাও”(বুখারী, কিতাবুত তালাক, হাদীস 4889, 4890, 4891, 4892)।

সুধীপাঠক, তাহলে কি বুঝলেন?? এতক্ষণ পর্যন্ত পড়ার যা মাথায় ঢুকল, তা হল-

1) স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়, তাহলে স্ত্রীর মধ্যে কোনও দোষ-ত্রুটি থাকতে হবে এবং সেই দোষ- ত্রুটি স্ত্রী সংশোধন করতে না চাইলে, তবেই স্বামী তালাকের পদক্ষেপ নিতে পারবে, নয়ত নয়!!

2) কিন্তু স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে সংসার না করতে চায়, সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে কোনও কারণ দেখাতে হবে না!! শুধু মাত্র স্বামীর সঙ্গে না থাকতে চাইলেই হল!! এককথায়, সব কিছুর মতই তালাকের ক্ষেত্রেও পুরুষের চেয়ে নারীর অধিকারইইইই বেশি!!

যাইহোক, প্রশ্ন হবে-“যদি কেউ বর্তমানে স্ত্রীকে এক বৈঠকে 3 তালাক দেয়, সেক্ষেত্রে কি হবে”??

এক্ষেত্রে অনেকেই বলেন যে, তালাক হয়ে যাবে, কিন্তু তালাক দাতার গুনাহ হবে!! এ বিষয়ে আমি নিজে কোনও মন্তব্য করছি না কিন্তু 2 টি হাদীস তুলে ধরতে চাইছি, হাদীস 2 টি হল-

“সুলাইমান ইবনে দাউদ (র) …. ইবনে মাখরামা (র) আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন তার পিতা হতে, তিনি বলেন- আমি মাহমুদ ইবনে লবীদ (রা)- কে বলতে শুনেছি যে, নবী (স)- কে এক ব‍্যাক্তি সম্পর্কে খবর দেওয়া হল, সে তার স্ত্রীকে একত্রে 3 তালাক দিয়েছে। এ কথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে দাড়িয়ে গেলেন এবং বললেন- সে কি আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করছে?? অথচ আমি তোমাদের মাঝেই রয়েছি!! তখন [নবী (স)- এর প্রতিক্রিয়া দেখে] এক সাহাবা দাঁড়িয়ে বললেন- হে আল্লাহর রাসুল (স), আমি কি তাকে হত‍্যা করব না”(নাষাই, কিতাবুত তালাক, হাদীস 3404)। এছাড়াও আরও একটা হাদীস দেখুন-

“ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম এবং মহাম্মদ ইবনে রাফে (র) বর্ণনা করেছেন…. ইবনে আব্বাস (রা) বলেন- নবী (স)- এর যুগে, আবুবকর (রা)- এর যুগে এবং উমার (রা)- এর যুগের প্রথম 2 বছরে এক বৈঠকে 3 তালাক 1 তালাক রুপে গণ‍্য হত। তারপর খলিফা উমার (রা) বললেন- লোকগণ একটি ব‍্যাপরে খুব তাড়াহুড়ো করছে। যাতে তাদের ধৈর্য্য অবলম্বনের সুযোগ ছিল। এখন বিষয়টি তাদের জন্য কার্যকর করে দিলে, তাই কল্যাণকর হবে। সুতরাং তিনি তা তাদের জন্য বাস্তাবায়িত করে দিলেন অর্থাৎ এক বৈঠকে 3 তালাককে 3 তালাক বলেই গণ‍্য করলেন”(মুসলিম, কিতাবুত তালাক, হাদীস 3539)।

সুধীপাঠক, এবার আপনি নিজে ঠিক করুন যে, এক বৈঠকে 3 তালাক বা “তালাক, তালাক, তালাক” বললেই তালাক হবে কি না?? আচ্ছা চলুন, এ বিষয়ে আরও 1 টি হাদীস পরিবেশন করি-

“ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবা আবু রুকানাহ তার স্ত্রী উম্মু রুকানাকে তালাক দিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের জন্য আবু রুকানাহ পেরেসান হয়ে পড়লেন। নবী (স) তাকে বললেন- স্ত্রীকে ফিরিয়ে নাও। তখন উক্ত সাহাবা বললেন- আমি তো তাকে 3 তালাক দিয়ে ফেলেছি। তখন নবী (স) তাকে বললেন- তা তো আমি জানি!! এটা তো মাত্র 1 তালাক বলেই গণ‍্য হয়েছে”(বুলুগুল মারাম, কিতাবুত তালাক, হাদীস 1107, 1108)।

বলে রাখা প্রয়োজন, এজন্যই বলছি। সুতরাং প্রথমে হাদীসটি দেখুন-

“ইবনে উমার (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (স) বলেছেন- তালাক হল হালাল বা বৈধ বস্তুর মধ্যে সব চেয়ে নিকৃষ্টতম বস্তু”(আবুদাউদ, কিতাবুত তালাক, হাদীস 2174, 2175)।

এবং ইসলাম চায়- কোনও স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক না দেয়, কোনও স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক না দেয় বা খুলা না নেয়!! কিন্তু বড় সাংসারিক বিপর্যয় এড়াতে তালাককে অনুমোদন করা হয়েছে। এবং ইসলাম এমন তালাক পদ্ধতি উপহার দিয়েছে যে, এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে তালাক কার্যকর হবে বলে মনে হয় না!! কেননা, “ইসলামী তালাক খুবই বড় এবং দীর্ঘদিনের প্রসেস”। তাই নয় কি??

আর একটি কথা না বললেই নয়, এখন ও আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আছেন কুরান হাদিস এ সব কিছু সহজ ভাবে বুঝানোর পর ও ফতুয়ার পিছু থাকেন, তাই কিছু ফতুয়া  পেশ করা হল।

ফতুয়া তালাক

১ মজলিস এ একত্রিত ৩ তালাক এক হিসেবে গন্য হয় ১ম হিজরী হতে এখন পর্যন্ত কোরআন সহীহ হাদীস ও এজমা এর উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর অনেক বড় বড় আলেমগন এমন ফতোয়াই দিয়েছেন ,

কিতাবগুলোর নামসমূহ ঃ
০১। (তাসমিয়াতুল মফতিন তালাক আসসালাসা লাফসুন ওয়াহিদ্দিন) এই কিতাবে পৃথিবীর পঞ্চাশটি বড় বড় মুফতি মুহাদ্দিসের দেওয়া ফতোয়া আছে সকলের মতে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।
০২। ফতোয়াল বারী এটি আর একটি বিখ্যাত কিতাব এই বইয়ের ৭ম অধ্যায়ের ৪৫৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।
০৩। (সারহুবানীল আসর যাহা হানাফী মাজহাবের একটি বিখ্যাত কিতাব) যার লেখক ইমাম তাহাবী এই কিতাবের ৩য় অধ্যায় পৃ. নং-৮৬-৮৮ ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

০৪। কিতাবে এ সারহে – অধ্যায় ১০ পৃষ্ঠা ৪৬৩,

০৫। ইবনে তাইমিয়া ছিলেন ৭ম হিজরীর একজন বিখ্যাত আলেমদ্বীন ওনার জন্ম ছিল (৬৬১-৭২৮ হিজরী) উনার ফতোয়া ছিল ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

৭ম হিজরীতে আরো একজন আলেম পাওয়া যায় যিনি ইবনে তাইমিয়ার আগের আলেম ছিলেন । যার নাম ইমাম আবু নাজম মোঃ ইবনুল কাসীর বিন হইবেতুল্লাহ যার মৃত্যু হয়েছিল ৬২৪ হিজরীতে তার মতেও ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

এছাড়া ৭ম হিজরীতে আরো একজন আলেম পাওয়া যায় যার নাম ইমাম ইবনে সাই (র.) যার জন্মছিল ৫৯৩ হি. এবং মৃত্যু ছিল ৬৭৪ উনার লেখা একটি বই এর নাম তারিক ইবনুল সাঈ যার ৯ম অধ্যায় ৩২৩/৩২৪ পৃষ্ঠা উল্লেখ আছে
আরো আগে যাই। ৬ষ্ঠ হিজরি ২ জন বড় আলেম পাওয়া যায়।
৬ষ্ঠ হিজরীতে ঃ- ইমাম ইবনে রুশ (জন্ম-৫২০ হিজরীতে- মৃত্যু ৫৯৫ ) উনার লেখা একটি বই আছে ”বিদায়াতুল মসতাহীদ” অধ্যায়- ৩৪৮-৩৫০ এ উল্লেখ্য আছে উমর এর শাসনামলে সাময়িক ভাবে এক মসলিশে তিন তালাক তিন গণ্য করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল তাঁর শাসনী আমল। কারন
ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে আব্দুর রাযযাকের প্রমুখাৎ, তিনি তাউসের পুত্রের বাচনিক এবং তিনি স্বীয় পিতার নিকট হতে আব্দুল্লাহ বিন ‘আব্বাস (রাঃ) এর সাক্ষ্য উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পবিত্র যুগে আর আবূ বাকরের (রাঃ) সময়ে আর উমার (রাঃ) এর খিলাফাতের দু’বৎসর কাল পর্যন্ত একত্রিতভাবে তিন তালাক এক তালাক বলে গণ্য হত।

অতঃপর উমার (রাঃ) বললেন, যে বিষয়ে জনগণকে অবকাশ দেয়া হয়েছিল, তারা সেটাকে তরান্বিত করেছে। এমন অবস্থায় যদি আমরা তাদের উপর তিন তালাকের বিধান জারী করে দেই, তাহলে উত্তম হয়। অতঃপর তিনি সেই ব্যবস্থাই প্রবর্তিত করলেন।

একত্রে তিন তালাক দেয়া হলে এক তালাক বলে গণ্য হবে। এর প্রমাণঃ (আবূ রুকানার স্বিতীয় স্ত্রী আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর নিকট তার শারীরিক অক্ষমতার কথা প্রকাশ করলে) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবদ ইয়াযীদকে (আবূ রুকানাকে) বললেন, তুমি তাকে ত্বালাক দাও। তখন সে ত্বলাক দিল। অতঃপর তাকে বললেন, তুমি তোমার (পূর্ব স্ত্রী) উম্মু রাকানা ও রুকানার ভাইদেরকে ফিরিয়ে নাও। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমিতো তাকে তিন ত্বলাক দিয়ে ফেলেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমি তা জানি। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, “হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে ত্বলাক দিবে তখন তাদেরকে ইদ্দাতের উপর ত্বলাক দিবে”। (আত-ত্বলাক ৬৫:১) (সহীহ আবু দাউদ হাদীস নং ২১৯৬)

উপরোক্ত হাদীসে বোঝা যাচ্ছে যে, উপরোক্ত হাদীসে তিন ত্বলাক দেয়া বলতে বিখ্যাত ভাষ্য গ্রন্থ ‘আউনুল মা’বুদ ৬ষ্ঠ খণ্ড ১৯০ পৃষ্ঠায় (আরবী) ব্যাখ্যায় (আরবী) উল্লেখ করেছেন। যার অর্থ আবূ রুকানা তার স্ত্রীকে এক সাথেই তিন ত্বলাক প্রদান করেছিলো।
এখন প্রশ্ন, উমার (রাঃ) এ নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন কেন? প্রকাশ থাকে যে,তালাক সম্বন্ধেও যখন লোকেরা বাড়াবাড়ি করতে লাগল আর যে বিষয়ে তাদেরকে অবসর ও প্রতীক্ষার সুযোগ দেয়া হয়েছিল তারা সে বিষয়ে বিলম্ব না করে শারী’আতের উদ্দেশ্যের বিপরীত সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে ক্ষিপ্রগতিতে তালাক দেয়ার কাজে বাহাদুর হয়ে উঠল,

তখন দ্বিতীয় খালীফা উমার (রাঃ)’র ধারণা হল যে, শাস্তির ব্যবস্থা না করলে জনসাধারণ এ বদভ্যাস পরিত্যাগ করবে না, তখন তিনি শাস্তি ও দণ্ডস্বরূপ এক সঙ্গে প্রদত্ত তিন তালাকের জন্য তিন তালাকের হুকুম প্রদান করলেন। যেমন তিনি মদ্যপায়ীর ৮০ দুররা আর দেশ বিতাড়িত করার আদেশ ইতোপূর্বে প্রদান করেছিলেন, ঠিক সেরূপ তাঁর এ আদশেও প্রযোজ্য হল। তাঁর দুররা মারা আর মাথা মুড়াবার আদেশ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং প্রথম খালীফা আবূ বাকর (রাঃ) এর সাথে সুসমঞ্জস না হলেও যুগের অবস্থা আর জাতির স্বার্থের জন্য আমীরুল মু’মিনীনরূপে তাঁর এরূপ করার অধিকার ছিল, সুতরাং তিনি তাই করলেন। অতএবং তাঁর এ শাসন ব্যবস্থার জন্য কুরআন ও সুন্নাতের নির্দেশ প্রত্যঅখ্যান করার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে টিকতে পারে না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও সুস্পষ্ট যে, খালীফা ও শাসনকর্তাদের উপরোক্ত ধরনের যে ব্যবস্থা আল্লাহর গ্রস্থ ও রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাতে বর্ণিত ও উক্ত দু’বস্তু হতে গৃহীত, কেবল সেগুলোই আসল ও স্থায়ী এবং ব্যাপক আইনের মর্যাদা লাভ করার অধিকারী।

সুতরাং উমার ফারূকের শাসনমূলক অস্থায়ী ব্যবস্থাগুলোকে স্থায়ী আইনের মর্যাদা দান করা আদৌ আবশ্যক নয়। পক্ষান্তরে যদি বুঝা যায় যে,তাঁর শাসনমূলক ব্যবস্থা জাতির পক্ষে সঙ্কট ও অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দণ্ডবিধির যে ধারার সাহায্যে তিনি সমষ্টিগত তিন তালাকের বিদ’আত রুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন,

তাঁর সেই শাসনবিধিই উক্ত বিদ’আতের ছড়াছড়ি ও বহুবিস্তৃতির কারণে পরিণত হয়ে চলেছে- যেরূপ ইদানীং তিন তালাকের ব্যাপারে পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, হাজারে ও লাখেও কেউ কুরআন ও সুন্নাহর বিধানমত স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করে কিনা সন্দেহ- এরূপ অবস্থায় উমার (রাঃ) এর শাসনমূলক অস্থায়ী নির্দেশ অবশ্যই পরিত্যাক্ত হবে এবং প্রাথমিক যুগীয় ব্যবস্থায় পুনঃ প্রবর্তন করতে হবে। আমাদের যুগের বিদ্বানগণের কর্তব্য প্রত্যেক যুগের উম্মাতের বৃহত্তর কল্যাণের প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং জাতীয় সঙ্কট দূর করতে সচেষ্ট হওয়া। একটি প্রশাসনিক নির্দেশকে আঁকড়ে রেখে মুসলমানদেরকে বিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেয়া উলামায়ে ইসলামের উচিত নয়।

উমার ইবনুল খাত্তাব বললেন- তিনটি বিষয়ের জন্য আমি যেরূপ অনুতপ্ত, এরূপ অন্য কোন কাজের জন্য আমি অনুতপ্ত নই,

প্রথমতঃ আমি তিন তালাককে তিন তালাক গণ্য করা কেন নিষিদ্ধ করলাম না।

দ্বিতীয়তঃ কেন আমি মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাসদেরকে বিবাহিত করলাম না,

তৃতীয়তঃ অগ্নিপতঙ্গ কেন হত্যা করলাম না। ইগাসার নতুন সংস্করণে আছে, কেন আমি ব্যাবসাদার ক্রন্দনকারীদের হত্যা করলাম না।

কোন দেশে যদি বিদ’আতী পন্থায় তালাক দেয়ার প্রবণতা প্রকট আকার ধারণ কের যেরূপ উমার এর যুগে ঘটেছিল তাহলে শুধুমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক যদি মনে করেন যে, এক সাথে তিন তালাকতে তিন তালাক হিসেবেই গণ্য করা হবে, তাহলে তিনি এরূপ ঘোষণা শাস্তিমূলকভাবে দিতে পারেন। কিন্তু বর্তমান যুগে সে যুগের ন্যায় অবস্থা সৃষ্টি হয়নি এবং নেই।

আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেছেন- দেখো, মাত্র দু’বার তালাক দিলেই স্ত্রীর ইদ্দতের মধ্যে পুরুষ তাকে বিনা বিবাহে ফিরিয়ে নিতে পারে। অতঃপর হয় উক্ত নারীর সাথে উত্তমরূপে সংসার নির্বাহ অথবা উত্তম রূপে বিচ্ছেদ। আর যে মাহর তোমরা নারীদের দিয়েছ তার কিছুই গ্রহণ করা তোমাদের জন্য হালাল নয়… (সূরা আল-বাকারাহঃ ২২৯) নবী (সঃ) এর জামানায় আবু বক্কর এর জামানায় ও তার পরবর্তী ওমরের শাসনামল ২ বছর পর্যন্ত ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইত।

যা পরবর্তী এখনো আলেমগণ একমত যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

আরো আগে যাই। ৫ষ্ঠ হিজরিতের আলেম পাওয়া যায়।
৫ম হিজরীতে ঃ- ইমাম ফকরুদ্দীণ আল রাজী আরেক নাম করা মুফাস্সির ও ফিকে ইমাম ছিল। উনার জন্ম ছিল ৫৪৪ হিজরী, মৃত্যু ছিল- ৬০৬। উনার একটি বিখ্যাত কিতাব আছে “তাফসীর আর রাজী” অধ্যায়-৬, পৃষ্ঠা-১০৪ উনার মতে ও প্রায় সকল আলেমের মতে যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইত।
তার আগে ৫ম হিজরীতে আরো ২জন আলেম পাওয়া যায়, যাদের মতেও যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।
ইমাম আহমদ বিন ইবনে মোহাম্মদ (জন্ম-৪০৬, মৃত্য- ৪৫৯) উনার বিখ্যাত কিতাব “আল মুকসে ফিল ইলমে সুরাত” পৃষ্ঠা- ৮০-৮২ যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

ইমাম মোঃ ইবনুল কাজী এ আজ তাঁর লেখা একটি কিতাব “মাজাহিবাল ইককাম” পৃষ্ঠা- ২৮৯, যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

এর আগেও ৪র্থ হিজরীতে আলেম পাওয়া যায় যাহার হানাফী মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তাদের মধ্যে-
১।​ইমাম আবু জাফর, তার মতেও যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

এর আগে ৩য় হিজরীতে একজন আলেম পাওয়া যায় ইমাম দাঊদ বিন আলী (মৃত্যু-২৭০ হিঃ) উনার একটি কিতাব ইলমাল মাআকিন, অধ্যায়-৪, পৃষ্ঠা- ৩৮৮, যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

এর আগে ২য় হিজরীতে আলেম পাওয়া যায় মোহাম্মদ বিন ইছহাক আল মাদানী যিনি ছিলেন ফিকা, ফতুয়া ও মোফাস্সির ইমাম তাঁর একটি কিতাব আছে “তাত তাওজি” অধ্যায়-২৫, পৃষ্ঠা- ১৯২ এর মতে যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

তার পর আরও একজন ইমাম পাওয়া যায় ইমাম তাহারী যিনি হানাফী মাজহাবের অনেক বড় আলেম ছিলেন উনার লিখা একটি বই “ইখতেলাফে উলামা” যার ২য় অধ্যায় পৃষ্ঠা নং- ৪৬২ এর মত যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।

১ম হিজরীতে ইজমা মতে যে ১ মজলিসে একত্রিত ৩ তালাক ১ হিসেবে গন্য হইবে ।
যার রেফারেন্স দিয়েছেন ইমাম ইবনুল কাইয়ূম কিতাব হলো ইলাবুল মকিন ।অধ্যায় : ৩ , পৃ. ৪৩ ।

৮ম হিজরীর আরেকজন আলেম পাওয়া যায় ইমাম ইউসুফ বিন আল হাদী মৃত্যু ৯০৯ হিজরী কিতাব হলো সাইরুল ইলা ইলম তালাকুস সালাসা ।

এই ছাড়াও বর্তমান যুগে অনেক বড় আলেম আছেন যেমন একজন হলো : ইমামা আল্লামা আল বানী যার কিতাব হলো সিলসিলাতুল হাদীসা আজাহিফা যার ৩য় অধ্যায় ২৭২ পৃ. ।

বর্তমান সময়ের আরেক বড় আলেম মুহাদ্দিস মুফাসসিরন নাছিরউদ্দিন আল বানী বলেন সকল আলেমগণ যেন সুন্নাতের দিকে ফিরে আসে ।
এছাড়া ও একহাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত (জামিয়াতুল আজহার ইউনিভার্সিটি) রয়েছে যার একটি কিতাব আছে ফিকাহ্ আর উপর :
(আল ফিকহু আল মাজহিল আরবা )বই লিখেছেন : আব্দুর রহমান আল জুজাইরি এখানে ও তালাকের বিভিন্ন মাছহালা সম্বন্ধে সহিহ হাদিস ফিকাহ্ আলমের ফতোয়া পাওয়া যায়।

ভারতের একজন বিখ্যাত মুফাসসির আলেমদ্বিন শায়েখ কেফায়েত উল্ল্যাহ সানাবিলী তার তালাকে আহকাম ও১ মজলিসে ৩ তালাক ১ হয় । তার বয়ানে এমনটাই কুরআন হাদীস ও ফতুলার মতে রেফারেন্স দিয়েছেন ।

রুজু কি?

রুজু আরবী শব্দ। অর্থ হল, ফিরিয়ে আনা।

কেউ যদি ১ বার তালাক অথবা ২ বার তালাক দিয়ে দেয়, অতঃপর রুজু করতে বলা হয়েছে। কিন্তু রুজু কিভাবে করতে হয় যদি একটু বিস্তারিত বলতেন। এবং স্ত্রি কে পুন্রায় ফিরিয়ে আনার জন্য কি করতে হবে? পুনরায় বিবাহ করতে হবে নাকি নিয়ে আস্লেই হবে ?

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

তালাকের পর রুজু করার মানে হল, এক বা দুই তালাকে রেজয়ীর মাধ্যমে স্ত্রীকে যে বিচ্ছেদ করে দেয়া হল, সেখান থেকে স্ত্রীকে আবার স্ত্রীর মর্যাদায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা।

এক বার বা দুই বার তালাক প্রদান করার পর স্ত্রীকে রুজু বা ফিরিয়ে আনার সময়সীমা হল, ইদ্দত তথা তালাকপ্রাপ্তা হবার পর তিন হায়েজ অতিক্রান্ত হবার আগেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা।

রুজু তথা ফিরিয়ে আনার পদ্ধতি হল, মুখে বলার মাধ্যমে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা। যেমন, আমি আমার স্ত্রীকে রুজু করলাম বা ফিরিয়ে আনলাম। বা তালাক ফিরিয়ে নিলাম ইত্যাদি।

অথবা আচরণের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা। যেমন স্ত্রীর সাথে শারিরীক সম্পর্ক করা। চুম্বন করা, কাছে টেনে নেয়া ইত্যাদি। সহজ কথায় স্ত্রীসূলভ আচরণ করার মাধ্যমে রুজু করা যায়। বা মুখে বলেও রুজু করা যায়।

الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ ۗ [٢:٢٢٩

তালাকে-‘রাজঈ’ হ’ল দুবার পর্যন্ত তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে বর্জন করবে। [সূরা বাকারা-২২৯]

আবার,অনুবাদ হবে এমন-“তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের তালাক দেয়ার পর যখন তারা ইদ্দত পূর্ণ করে নেয়, তখন তাদের নিজেদের প্রস্তাবিত স্বামীদের সাথে বিয়ের ব্যাপারে তোমরা বাধা দিও না, যখন তারা প্রচলিত পদ্ধতিতে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্মত হয়”(2:232)।

প্রথমবার 3 মাসে 3 তালাক হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হওয়ার পর, যদি স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সম্মত না হয়ে সংসার জীবন-যাপন করতে চাইবে, ততক্ষণ স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না!! আর, যদি স্বামী স্ত্রীকে 3 মাসের মধ্যে ফিরিয়ে না আনে, সেক্ষেত্রে স্ত্রী অন্য কোনও পুরুষকে বিবাহ করতে পারে।

তবে, যদি স্ত্রী 3 মাস পরও অন্য কোনও পুরুষকে বিবাহ না করে, সেক্ষেত্রে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে এনে পুনরায় সংসার জীবন-যাপন করতে পারবে।

যারা তালাক প্রসঙ্গে ইসলামের দুর্নাম-বদনাম করে!! এবং তাদের একটা প্রশ্ন করতে চাই যে-“ইসলামী তালাক পদ্ধতির চেয়ে ভাল কোনও তালাক পদ্ধতি পৃথিবীতে আছে”??

বিজ্ঞ ও বিবেকবান আলেম সমাজের কাছে বিনীত অনুরোধ, আপনাদের মুখের পানে চেয়ে থাকা সরল মানুষগুলোর জীবনকে সহজ, সরল ও শান্তিময় করার জন্য মহান আল্লাহতায়ালা যে বিধান দিয়েছেন তা সঠিকভাবে প্রকাশ করুন। অযথা কাঠিন্য আরোপ ও মনগড়া রীতির উদ্ভব ঘটিয়ে শান্তির ধর্ম ইসলামকে হাস্যস্পদ ও জটিল করে তুলবেন না। ইহকাল ও পরকালীন শান্তি ও মুক্তি প্রাপ্তিই যেন আমাদের সবার মূল লক্ষ্য হয়।

আমাদের দেশে সেই পাকিস্তানী আমল থেকে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ দ্বারা তালাকে বিদা নিষিদ্ধ এবং হিল্লা বিয়ের প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। আশা করি বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশেও এই আইন কার্যকর হবে এবং হিল্লা বিয়ের মত অনৈসলামিক প্রথা চিরতরে ইসলামী সমাজ থেকে বন্ধ করা যাবে। এ ব্যাপারে আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে যেন ধর্মের নামে হিল্লা বিয়ে দিয়ে কোন মা-বোনের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা না হয়।

যদি কোথাও এরকম কোন দুঃখজনক পরিস্থিতি দেখা দেয় তবে সেই বিপদের হাত থেকে অসহায় নারীকে উদ্ধার করা ওয়াজিব। জেনে শুনে যারা অসহায়কে সাহায্য করে না তাদের উপর আল্লাহর রহমত আসে না। এ ব্যাপারে কারো সহযোগিতা না পেলে সরাসরি স্থানীয় প্রশাসন, থানা অথবা গণমাধ্যমকর্মীর সাহায্য নিন।

NO COMMENTS

Leave a Reply