গাজীপুরে বিশ্ব ইজতেমার প্রস্তুতিমূলক পর্যালোচনা সভা

মুহাম্মদ আতিকুর রহমান (আতিক), গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি: গাজীপুরের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক অগ্রগতি ও প্রস্তুতিমূলক মতবিনিময় সভা ৭ জানুয়ারি রবিবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের টঙ্গী অঞ্চল-১ এর সম্মুখ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রীয় বিশেষ কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি অনুপস্থিত থাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল এ সভায় সভাপতিত্ব করেন।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক ডঃ দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীরের সঞ্চালনায় এ সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নান, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার এম বজলুল করিম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হেলাল উদ্দীন, গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোঃ হারুন অর রশিদ পিপিএম বিপিএম বার, গাজীপুর সির্ভিল সার্জন ডাঃ সৈয়দ মঞ্জুরুল হক, বিশ্ব ইজতেমা আয়োজক কমিটির মুরুব্বী ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিন, ইঞ্জিনিয়ার মেজবাহ উদ্দীন, ডঃ রফিকুল ইসলাম, টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।

এছাড়া ঢাকা উত্তর ডিসিসহ পুলিশ এবং র‌্যাবের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ সভায় নিজ নিজ দপ্তরের ইজতেমায় বিভিন্ন সেবাদানের কার্যক্রম সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন।

মতবিনিময় সভায় প্রতিটি বিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ প্রত্যেকে তাদের কাজের অগ্রগতী সম্পর্কে অবহিত করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআরটিসি, বিআরটিএ, ডেসকো, তিতাস গ্যাস, টেলিফোন, ফায়ার সার্ভিস, ওয়াসা, এলজিইডি, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, গাজীপুর জেলা পুলিশ প্রশাসন ও গাজীপুর জেলা প্রশাসন প্রভৃতি।

সভায় সভার সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ও প্রস্তুতি সন্তুষজনক হওয়ায় সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, প্রতিবছরই আমরা প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তর সমূহের সহযোগিতা নিয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আগত দেশ-বিদেশের লাখো লাখো মুসল্লীদের সেবায় এবং তাদের সুবিধার্থে বিভিন্ন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে যাচ্ছি। এবারও ইনশাআল্লাহ সকল সংস্থা ও দপ্তর সমূহের সার্বিক সহযোগিতায় আমরা ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমা সম্পন্ন করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক খোঁজখবর রাখছেন।

মেয়র অধ্যাপক মান্নান বলেন, বিশ্ব ইজতেমায় আগত লাখো লাখো মুসল্লীদের সেবা করা অনেক পুণ্যের কাজ বলেই আমরা মনে করি। তাই বিশ্ব ইজতেমাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে আমাদের সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় প্রতি বছর সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে যাচ্ছি। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকল দপ্তর ও সংস্থা কাজ করে যাচ্ছেন। এবারও আশা করছি সুষ্ঠু এবং নিরাপদে বিশ্ব ইজতেমা দুই পর্বে সম্পন্ন হবে ইনশাআল্লাহ।

তিনি আরো বলেন, বিশ্ব ইজতেমায় আগত লাখো মুসল্লীদের সুবিধার্থে স্থানীয় হোটেল রেস্তোরায় পচা বাশি খাবার পরিবেশন থেকে বিরত থাকার ও বাজারের নিত্য পণ্যের জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি করে অতি মুনাফা থেকে ব্যবসায়ীদের বিরত থাকার আহ্বান জানান।

বিশ্ব ইজতেমার মুরুব্বী রফিকুল ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ভিসা জটিলতার কারণে কেউ কেউ বিশ্ব ইজতেমায় শরীক হতে পারছেন না বলে উল্লেখ করে বিশ্ব ইজতেমা সর্বোচ্চ মুরুব্বী হযরত মাওলানা সা’দ সাহেবের নাম উল্লেখ করে বলেন, এবার যেন এধরনের ঘটনা আর না ঘটে।

গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার জানান, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে ৮ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। প্রতি পর্বের ইজতেমায় পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যবৃন্দ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। এতে প্রায় ১০হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পোশাকী ও সাদা পোশাকী হিসেবে দায়িত্বে থাকবে। এতে র‌্যাব, পুলিশ, ১৫টি ওয়াচ টাওয়ার, সিসি ক্যামেরা, আকাশে হেলিকপ্টার টহল, নৌ পথে নৌ টহল, সড়ক মহাসড়কে পুলিশ ও সাদা পোশাকী সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। থাকবে ভ্রাম্যমান আদালত, স্বাস্থ্য বিভাগের বেশ কতগুলো এ্যম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের এ্যম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হাসপাতালে অতিরিক্ত ডাক্তার, অতিরিক্ত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।

ইজতেমায় দেশী-বিদেশী মুসল্লীদের স্বাগত জানিয়ে ১৩টি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। ইজতেমা ময়দানের সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিং করার লক্ষ্যে র‌্যাবের জন্য ৯টি ও পুলিশের জন্য ১৫টি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে।

ইজতেমায় আগত মুসল্লীদের ওজু, গোসল, পয়ঃনিষ্কাশন ও সুপেয় পানি সরবরাহের জন্যে ইজতেমা ময়দানে ১৩টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন ঘন্টায় ৩কোটি ৫৪লাখ গ্যালন সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। চাহিতা মতাবেক ১০০ ড্রাম ব্লিচিং পাউডার সরবারাহ করা হয়েছে। ইজতেমা চলাকালে প্রতিদিন ২১টি গার্বেজ ট্রাকের মাধ্যমে দিন-রাত বর্জ্য অপরাসণ কার্যক্রম নিশ্চিত করা হয়েছে। নিরাপত্তা দিোয়ত্বে নিয়োজিত সদস্যদেও জন্য ১৫৪টি অস্থায়ী টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। আগত বিদেশী মেহমানের রান্না কজের জন্য ১৩৬ গ্যাসের চুলা স্থাপন করা হয়েছে। যাহা সার্বক্ষণিক মনিটর করা হবে। ইজতেমা ময়দানে ২৬টি ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চান্দনা-চৌরাস্তা পর্যন্ত মহাসড়কের দুইপাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা, রাস্তার উপর পার্কিং করা গাড়ি সরানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। টঙ্গী ব্রীজ ও কামার পাড়া ব্রীজর নীচে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার জন্য বাঁশ দ্বারা ২টি নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছে।

গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইজতেমা উপলক্ষে ১২জানুয়ারি থেকে ২১জানুয়ারি পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসক সেবা প্রধানের জন্য সিটি কন্ট্রোলরুমের সামনে ৪৫টি চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ২৫জন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ইজতেমা ময়দানে দায়িত্ব পালন করবেন। ১৪টি এম্বুলেন্স ইজতেমা ময়দানে আগত মুসল্লীদের সেবায় নিয়জিত থাকবে।

গাজীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইজতেমার প্রথম পর্বে ইজতেমা ও এর আশাপাশের এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ৬হাজার পুলিশ সদস্য এবং দ্বিতীয় পর্বেও ৬হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবে। পুলিশের পক্ষ থেকে ইজতেমা ময়দানে প্রধান একটি কন্ট্রোল রুম এবং আরোও ৫টি সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। ইজতেমা ময়দানে ৭হাজার

৫’শ পুলিশ সদস্য থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইজতেমা ময়দানে ৮’শ সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়াও পুলিশের পক্ষ থেকে নৌ ও সড়কপথে ৫টি মোবাইল টিম স্বার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করবে।

ঢাকা মেট্রো পলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইজতেমা ময়দানে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি, বোম ডিস্পোজাল ইউনিট ও সোয়াট সদস্যরা উপস্থিত থাকবে।

৫৩ তম বিশ্ব ইজতেমা ২০১৮ এর দুই পর্বের প্রথম পর্ব শুরু হবে ১২জানুয়ারি এবং আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে ১৪জানুয়ারি। মাঝখানে ৪দিন বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে ১৯জানুয়ারি এবং আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে ২১জানুয়ারি। বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে জেলাওয়ারি মুসল্লীদের জন্য স্থান(খিত্তা)নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রথম পর্বে ২৭টি খিত্তা এবং দ্বিতীয় পর্বে ২৯টি খিত্তা স্থাপন করা হবে। প্রথম পর্বে দেশের ৩২টি জেলার ধর্মপ্রাণ মুসল্লীগণ অংশ গ্রহণ করবেন।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *