প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটি গান আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে

দিনাজপুর ঃ চার বছর বয়সে রেডিওতে ‘‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’’ গানটি শুনে জীবন যুদ্ধ শুরু করে প্রতিবন্ধি সংগীত শিল্পী হূমায়ারা পারভিন রিতা। প্রতিদিন রেডিওতে গান শুনে আর গুন গুন করে রপ্ত করে। পাড়া প্রতিবেশী সকলকে গান শোনায়। একদিন হঠাৎ করেই তার কন্ঠ ধরা পড়ে সংগীত বিশেষজ্ঞ ওস্তাদ শানুর কাছে। এত সুন্দর মধুর কন্ঠ সে আর কোনদিন শোনেনি। প্রতিবন্ধি রিতা ওস্তাদ শানুকে জানায়, সে দেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী হয়ে পরাজিত জীবনকে জয় ও অসম্ভবকে সম্ভব করতে চায় রিতা। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। অসম্ভবকে সম্ভব করেছে সে কিন্তু আত্ম তৃপ্তি পায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে গান গেয়ে আত্ম তৃপ্তি পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে রিতা। সে দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাশা করে তার গান শুনে এক ফোটা চোখের জল ফেলতে হবে প্রধান মন্ত্রীকে। ১৯৮৮ সালের ১লা ডিসম্বর দিনাজপুর শহরের মাহুতপাড়া গ্রামে জন্ম হয় রিতার। পিতা হামিদুল হক ও মাতা কামরুন নেছা। এক ভাই কামরুল হাসান মামুন। জন্মের ১০ মাস পরেই পোলিও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সমগ্র শরীর বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে। চোখ, জিহ্বা উল্টে যায়। পিতা মাতার একমাত্র কন্যা রিতাকে বাঁচাতে চিকিৎসক, কবিরাজ কোন কিছুই বাদ দেয়নি। কিন্তু বিধাতার লিখন কোমর থেকে নি¤েœ দুটি পা সম্পন্ন ভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। মাথা থেকে কোমড় পর্যন্ত দেখলে মনে হবে না রিতা প্রতিবন্ধি (পঙ্গু)। কোমড় থেকে পা পর্যন্ত বিধাতা তার শক্তি কেড়ে নিলেও (পঙ্গুত্ব করে দিলো) কন্ঠে তার ঢেলে দেয় মিষ্টি মধুর সুর। দরদি কন্ঠ ও এই মিষ্টি সুরের মহোময় সুরের আবেশে ভিজে যায় দর্শক শ্রোতার চোখের পাতা। দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গ সারা জাগায় রিতা। দেশের গান, লোক সংগীত, হাম, নাত, আধুনিক গানের প্রতিযোগীতায় জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে শত শত পুরষ্কার ও সনদ ছিনিয়ে আনে বিজয়ের বলে কিন্তু প্রতিবন্ধি হওয়ায় সমাজ তাকে মেনে নিতে পারেনি। মাতা কামরুন নেছা জানান, প্রতিবন্ধি হওয়ায় সকলেই রিতাকে ভর্সনা ও ঘৃণা ভরে প্রত্যাখান করেছে। প্রথমে সে রিতাকে নিয়ে শহরের কলেজিয়েট গার্লস হাই স্কুলে গিয়েছিল কিন্তু ভর্তি নেয়নি। প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য ছিল এ ধরনের প্রতিবন্ধি স্কুলে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ছোট ছোট মেয়েরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এভাবেই কোন স্কুলেই ভর্তি হতে পারছিল না প্রতিবন্ধি রিতা। ১৯৯৬ সালে হঠাৎ করেই রিতার জীবনে আসে বন্ধু সৈয়দ মোঃ রফিকুল ইসলাম (রফিক)। তার প্রচেষ্টায় ১৯৯৭ সালে শহরের নিমনগর বালিকা আলিম মাদ্রাসায় ৫ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ওই স্কুল ও কলেজ থেকেই এস.এস.সি/এইচ.এস সি পাশ করে। বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজে সমাজ বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত আছে। চ্যালেন আই সেরা কন্ঠ ২০১০ সে সময় সকলের হৃদয় ছুয়ে গিয়েছিল মাতৃপ্রেম। ¯েœহময়ী জননীর স্মরণে কেঁদেছিলেন কেউ কেউ। তার কন্ঠে বিচারকের আসনে বসা দেশের প্রীতিমান ৩ শিল্পী রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, সুবির নন্দী ও সুরকার গীতিকার আলাউদ্দীন আলী কিছুক্ষন ছিলেন বাক্রুদ্ধ। তারা স্যালুট জানিয়ে বলেছিলেন রিতা তুমি অসম্ভবকে সম্ভব করেছ। একদিন তুমি বড় শিল্পী হবে। কিন্তু ৬ লক্ষ ভোট পাওয়ার পরও হূমায়ারাকে অষ্টম স্থান দিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়। প্রথম করা হয় ৮৭ হাজার ভোটে বিজয়ী কৃষ্ণা তিথি খানকে। রিতার বাদ পড়াকে মেনে নিতে পারেননি কন্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও সুরকার আলাউদ্দীন। তারা বিচারকের মঞ্চ থেকে ওর্য়াকআউট করেন। চ্যালেন আই সেরা দশ জনের মধ্যে ৯ জনকে নিয়ে যান বিদেশে। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্বেও যেতে পারেনি রিতা। পাননি পারিশ্রমিক ১ লক্ষ টাকা। চ্যালেন আই সেরা কন্ঠ থেকে বাদ পড়া ও বিদেশ যেতে না পারার কারন বুঝে উঠতে তার একটুও কষ্ট হয়নি। কান্না জড়িত কন্ঠে রিতা জানান, এতে কারও দোষ নেই। দোষ আমার কপালের। পঙ্গুত্ব আমার জীবনের একমাত্র অভিশাপ। ৭ বছর থেকেই মঞ্চে গান গেয়ে তিনি মানুষের মন জয় করেছে ক্ষণিকের জন্য। গান শেষ মানুষের মন থেকে বেরিয়ে পড়েছে। মানুষের ভালবাসা গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত। রিতা জানায়, বিএনপির শাসনামলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডঃ খন্দকার, মোশারফ হোসেন, মোসাদ্দেক হোসেন ফালু, এরশাদ আমলে জিএম কাদের, আওয়ামী লীগের আমলে সাংস্কৃতিক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, তথ্য ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী তারানা হালিম, হুইপ ইকবালুর রহিম এমপিসহ অসংখ্য এমপি মন্ত্রীর সামনে গান গেয়েছেন। সকলেরই আশ্বাস ছিল হূমায়রা পারভিন রিতার শেষ ইচ্ছা পূরণ করবে কিন্তু আজও তা স্বপ্ন হয়ে রয়েছে। রিতা জানায়, তার শেষ ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে একটি গান গাইবেন এবং এই অসহায় জীবন থেকে মুক্ত হতে একটি সরকারি চাকুরি ও নিজস্ব গানের অ্যালবাম বের করবেন। কিন্তু সে আশা পূরন হবে কি না আজও প্রহর গুনছে রিতা। রিতা জানায়, তথ্য ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী তারানা হালিম তাকে কথা দিয়েছিলেন ও তার মোবাইল ফোন নম্বরটি নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে একটি গান গাওয়ার সুযোগ করে দিবেন। সে আশায় এখনও বসে আছেন রিতা। রিতার স্বামী সৈয়দ মোঃ রফিকুল ইসলাম রফিক জানান, ২০১২ সালে বিয়ে করার পর তার চ্যালেঞ্জ ছিলো রিতাকে সে একজন দেশের প্রতিভাবান শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলবে। কিন্তু অর্থের অভাবে সে আশা পূরণ হয়নি। রিতাকে বিয়ে করার পর পিতামাতা, ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন থেকে সে বিতাড়িত। সবার মুখেই একটি কথাই ছিল জীবনে কোনদিন পিতা হতে পারবি না। কিন্তু বিধাতার আর্শীবাদ বিয়ের পর রিতার যৌনশক্তি ফিরে আসে। রিতার গর্ভে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। তার বয়স এখন ৪ বছর। নাম রাখা হয়েছে সৈয়দা রাফিকাত বিনতে হূমাইয়া রিফা। রিতার মাথা গুজার নিজস্ব কোন স্থান নেই। স্বামী, কন্যা সন্তান নিয়ে পিত্রালয়ে বসবাস করছে। ভীষন যন্ত্রণা, কষ্ট, দুঃখ আর হতাশা এখনও পিছু ছাড়েনি উত্তরবঙ্গের আলোড়িত মধুর কন্ঠস্বর প্রতিবন্ধি সংগীত শিল্পী হূমায়ারা পারভিন রিতার। কান্নাজড়িত কন্ঠে রিতা বলেন, সরকারি ভাবে মাসে ৩ শত টাকা প্রতিবন্ধি ভাতা পায়। এ ভাতা সে নিতে চায় না। সে চায় সংগীতকে ধারন করেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু এতে প্রচুর অর্থ ও সহযোগীতার প্রয়োজন। আমার এই পঙ্গুত্বে অসহায় অবস্থা দেখে সবাই আমাকে শুধু আশ্বাস দেন। কিন্তু চোখের আড়াল হলেই সবাই ভুলে যান তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি। তাই সে ‘‘আমার সোনার ময়না পাখি কোন দেশেতে চলি গেলি রে দিয়া মোরে ফাঁকি রে’’ এই গানটি কন্ঠে ধারন করেই বেঁচে আছে প্রতিবন্ধি হূমায়ারা পারভিন রিতা।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *