বন্দর নগরজুড়ে গুঞ্জন, কে হচ্ছেন মেয়র -

বন্দর নগরজুড়ে গুঞ্জন, কে হচ্ছেন মেয়র

ভোট নিয়ে ভোটাররা এখন আর ততটা আগ্রহী নন, যতটা আগ্রহ ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন কে পাচ্ছেন, সে সংবাদ পেতে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন আওয়ামী লীগের মনোনয়নকেই নির্বাচনের অর্ধেকটা মনে করছেন ভোটাররা। তাই এ মুহূর্তে বন্দরনগরী চট্টগ্রামজুড়ে একটাই গুঞ্জন, কে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন? কে হচ্ছেন চট্টগ্রামের পরবর্তী মেয়র?

শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) মেয়র পদে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ১৯ জন। সিটি করপোরেশনের মোট ওয়ার্ড ৪১টি, সংরক্ষিত নারী আসন ১৪টি। এর বিপরীতে ৪০৬ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী কাউন্সিলর ফরম সংগ্রহ করেছেন। আগামীকাল (শনিবার) সন্ধ্যা ৭টায় সব মেয়র ও কাউন্সিলরপ্রার্থী গণভবনে আসবেন। তারা সেখানে রাতের খাবারও খাবেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী কে হচ্ছেন সেখানেই তা ঘোষণা হতে পারে।’

আগামী মার্চের শেষ সপ্তাহে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয় সামনে রেখে গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করে আওয়ামী লীগ। ঢাকায় দলীয় কার্যালয়ে ফরম বিক্রি ও জমা নেয়া হয় গতকাল শুক্রবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত। মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরুর পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বন্দরনগরীর সর্বত্র গুঞ্জনের ডালপালা মেলতে থাকে। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের খবরের ওপর ভিত্তি করে একেকদিন একেকজন প্রাধান্য পেতে থাকেন আলোচনায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমেও নিজ নিজ সমর্থিত প্রার্থীর সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চলতে থাকে।

মনোনয়ন বিক্রির প্রথম দিন সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, সাবেক মন্ত্রী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম বিএসসি, নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে শিল্পপতি মুজিবুর রহমান ও মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম চৌধুরী।

তাদের মধ্যে গত প্রায় বছরখানেক ধরে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানিয়ে আসছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। গত নির্বাচনে এমপি পদের মনোনয়ন হাতের নাগালে এসে ফসকে গেলেও এবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী তিনি। নাগরিক উদ্যোগের প্রধান এই উপদেষ্টা জনবান্ধব নানা কর্মসূচি দিয়ে বছরজুড়ে ছিলেন আলোচনায়। একই সঙ্গে কিছুটা জোরেশোরে শোনা যাচ্ছিল মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর নাম।

মনোনয়ন ফরম কিনে আলোচনায় আসেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এই রাজনীতিক, শিল্পপতি ও কলামিস্ট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি। আগেরবার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করা হলেও এখন সে দায়িত্বেও নেই তিনি। তবে দলের কেন্দ্রীয় ও নগরপর্যায়ে তার রয়েছে শক্ত অবস্থান।

পরের দিন মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন সংগ্রহ করেন চসিকের বর্তমান মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. ইউনুছ।

তাদের মধ্যে বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছিরের কর্মকাণ্ড নিয়ে অস্বস্তি আছে দলের মধ্যেই। তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অপছন্দের খবরও চাউর আছে। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বাদ পড়ার ঘটনা চিন্তার ভাঁজ এনে দিয়েছে আ জ ম নাছির উদ্দিনের কর্মী-সমর্থকদের কপালে। তবে তাদের আশা শেষ পর্যন্ত ‘যোগ্যতার’ লড়াইয়ে আ জ ম নাছিরই টিকে যাবেন। এছাড়া সাবেক মেয়রপুত্র নওফেল নাকি মেয়রপ্রার্থী, এই সমীকরণে বিষয়টি অনেকদিন ঝুলে থাকলেও শেষ পর্যন্ত শিক্ষা উপমন্ত্রীর পদ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চেয়েছেন নওফেল। এতে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বিরাজ করতে নাছির শিবিরে।

তবে সেই গুঞ্জনে নতুন মাত্র যোগ হয় মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহে। বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) আবদুচ ছালাম ছাড়াও মনোনয়ন সংগ্রহ করেন সাবেক কাউন্সিলর রেখা আলম চৌধুরী, হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফান, মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম, ইনসান আলী ও সাবেক সংসদ সদস্য মইনুদ্দীন খান বাদলের স্ত্রী সেলিনা খান।

মেয়র পদে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যানকে মানা হচ্ছে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে। তার মেয়াদেই চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় বাজেটের (সবমিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা) উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করে চউক (সিডিএ)। জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প আলোর মুখ দেখে তার সময়েই। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে তার সময়েই নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার। এছাড়া বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণ, সংস্কার-সম্প্রসারণ, নগরীর বিভিন্নস্থানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো মেয়াদজুড়ে নগরে আলোচনায় ছিলেন তিনি।

একই সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য জহুর আহমেদ চৌধুরীর ছেলে হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফানের নাম। নগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হেলাল উদ্দিন বিজিএমইএ’র পরিচালক ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হেলাল উদ্দিনের বড় ভাই সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। মেজ ভাই মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বর্তমান নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও (চট্টগ্রাম-১০ আসন) দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন হেলাল উদ্দিন। যদিও সেসময় তাকে নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়।

গত বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন সংগ্রহ করে বোমা ফাটান চসিকের সাবেক মেয়র মনজুর আলম। একইদিন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এ কে এম বেলায়েত হোসেন।

আওয়ামী লীগের নিকটজন হিসেবে পরিচিত মনজুর আলম এর আগে বিএনপির সমর্থন নিয়ে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটির মেয়র হয়েছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ এ কারণে তাকে নিয়ে আলোচনায় সরব। ২০১০ সালে সিটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনোনীত হন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে তিনি আবার বিএনপির সমর্থনে প্রার্থী হন। তবে নির্বাচনের দিন সকালে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। সেই মনজুর আলমই ভোল পাল্টে এবার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করতে চাইছেন

তবে তার কর্মী-সমর্থকরা মনে করেন, মনজুর চট্টগ্রামের অন্যতম সফল মেয়র। তার ইতিবাচক ইমেজ রয়েছে। একজন সজ্জন হিসেবে সবার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। তাই আওয়ামী লীগ দলীয় কোন্দল এড়াতে এবার তাকেই বেছে নেবে।

গতকাল শুক্রবার শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহাবুবুল আলম। এদিন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন সংসদ সদস্য ডা. আফছারুল আমীনের ভাই এরশাদুল আমীন, লন্ডন প্রবাসী ব্যারিস্টার মো. মনোয়ার হোসেন, ৩২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা দীপক কুমার পালিত।

ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে কেউ একজন এবার মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনোয়ন পাচ্ছেন- এমন গুঞ্জনও অনেকদিনের। ঢাকা উত্তরে পরপর তিনবার ব্যবসায়ী নেতা প্রয়াত আনিসুল হক ও আতিকুল ইসলাম মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আরও একজন ব্যবসায়ীকে মেয়র হিসেবে দেখতে যাচ্ছে দেশবাসী, এ খবর বেশ শক্তভাবে আসছে আলোচনায়।

গুঞ্জন আছে সাবেক মেয়রপুত্র ও শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেল এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ চেম্বারের সভাপতি মাহাবুবুল আলমকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাইছেন। এছাড়া ব্যবসায়ী নেতাদের একাংশ তার হয়ে কাজ করছেন।

সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আজ (শনিবার) সন্ধ্যা ৭টায় আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভা শেষে। গণভবনে অনুষ্ঠিতব্য সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি বোর্ডের সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং ঢাকা-১০, বগুড়া-১, বাগেরহাট-৪, যশোর-৬ ও গাইবান্ধা-৩ সংসদীয় আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। এমনটি জানিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *